কাশ্মির উত্তপ্ত,জাতিসংঘে বৈঠক: উপমহাদেশে কি নতুন শীতল যুদ্ধের সূচনা?

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • ২০২৫-০৫-০৫ ১২:৪৭:৫০
image

কাশ্মির আবারও পরিণত হয়েছে উপমহাদেশীয় ভূ-রাজনীতির জ্বলন্ত কেন্দ্রবিন্দুতে। গত ২২ এপ্রিল পহেলগামের নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার রক্তাক্ত ছাপ মুছতে না মুছতেই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের পারদ চড়ছে নতুন মাত্রায়। এই প্রেক্ষাপটে আজ সোমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মুখোমুখি হতে চলেছে বিশ্বের দুই চিরবৈরী প্রতিবেশী-দিল্লি ও ইসলামাবাদ।
গোপন কূটনীতির অঙ্গনে চুপিসারে বড় কিছু ঘটতে চলেছে, এমনটাই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, এই বৈঠক ভারতের ‘সার্জিকাল প্রস্তুতি’ এবং পাকিস্তানের ‘দ্রুত প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি’র ঠিক মাঝখানে ঘটছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের অনুরোধে আয়োজিত এই বিশেষ আলোচনার আহ্বায়ক দেশ গ্রিস, যারা বর্তমানে কাউন্সিলের সভাপতিত্বে রয়েছে।

পহেলগাম হামলার প্রতিক্রিয়া: ঘোলা জলে বৈশ্বিক রাজনীতি?
কাশ্মিরের পহেলগাম পর্যটন এলাকায় চালানো ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান কমপক্ষে ২৬ জন। ভারত তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানকে দায়ী করলেও, ইসলামাবাদ তা নাকচ করেছে ‘ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যায়।
পাকিস্তান এই হামলাকে কেন্দ্র করে ‘আঞ্চলিক উন্নয়নের’ নামে এক বিস্তৃত কূটনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে, যার আওতায় জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তো রয়েছেই, পাশাপাশি ইঙ্গিত দিয়েছে ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করারও। এই চুক্তি দীর্ঘদিন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য হিসেবে বিবেচিত।

সুরক্ষিত সভাকক্ষে নতুন ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা
বিশ্ব রাজনীতির পাঁচ প্রধান শক্তি-যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন, যাদের প্রত্যেকেরই দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। সাথে থাকবেন আরও ১০টি অস্থায়ী সদস্য দেশ, যার মধ্যে পাকিস্তান নিজেই অন্যতম। অনেকেই বলছেন, এই বৈঠক শুধু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কই নয়, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর সম্ভাবনা রাখে।

মধ্যস্থতার ভূমিকায় কে?
এই উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়া ও ইরান নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে, যদিও ভারত এখন পর্যন্ত কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত যেন উত্তেজনার বাইরে থেকে সন্ত্রাস দমনকে অগ্রাধিকার দেয়, আবার চীন চাইছে সীমান্ত অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের উদ্বেগ: ছায়া বিস্তার করছে সংঘাতের?
এই উত্তেজনার ঢেউ সরাসরি পৌঁছেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও। বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান নতুন করে শঙ্কিত যে, উপমহাদেশ আবারও বড় কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান উভয়েরই পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার এবং অস্থির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

জাতিসংঘ বৈঠকের পর কী ঘটতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ এই পরিস্থিতিতে একটি 'ব্যালান্সড স্টেটমেন্ট' দিতে পারে, যা উভয়পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাবে। তবে, পাকিস্তান চাইবে ভারতকে একটি কূটনৈতিকভাবে আক্রমণ করা হোক, যেখানে কাশ্মির ইস্যু আবারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠে আসে। অন্যদিকে, ভারত চাইবে, নিরাপত্তা পরিষদ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একতরফা বার্তা দিক এবং পাকিস্তানের প্রতি চাপ সৃষ্টি করুক।

শান্তি না উত্তেজনা-রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কী নির্ধারিত হবে দক্ষিণ এশিয়ার ভাগ্য?
আজকের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক হতে পারে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এটি হয়তো ভারত-পাকিস্তানকে নতুন সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেবে, নয়তো উন্মোচন করবে এক নতুন কূটনৈতিক দ্বার, যেখানে পারমাণবিক ছায়া থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়া হাঁটবে শান্তির পথে।
বিশ্ব এখন অপেক্ষায়, জাতিসংঘের সিলগালা কক্ষে কী ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় উপমহাদেশের।

তথ্যসূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডন, রয়টার্স, আল-জাজিরা, জাতিসংঘ প্রেস অফিস