শুক্রবার বিকেল। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ধনাগোদা স্কুল অ্যান্ড কলেজ চত্বর তখনো ছিল ছাত্রদের কোলাহলে মুখর। ঠিক সেই সময়েই ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি-বরং প্রশ্ন তোলে, আমরা কি আরেকটি তরতাজা জীবন রক্ষা করতে পারতাম না?
মাত্র ১৬ বছরের পারভেজ বেপারী-যে প্রতিদিন স্কুলে ক্লাস করত, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খেলা করত, আর স্বপ্ন দেখত উচ্চশিক্ষার। শুক্রবার বিকেলে সে নিজেই হয়তো নতুন এক 'অভিযানে' নেমেছিল-মোটরসাইকেল চালানোর আনন্দে। কিন্তু সেই আনন্দ এক মুহূর্তেই রক্তাক্ত পরিণতির দিকে মোড় নেয়।
বেপরোয়া গতি, নিয়ন্ত্রণ হার, আর তারপর...নিস্তব্ধতা
প্রত্যক্ষদর্শী নাজমুল বলেন, “ছেলেটি অনেক দ্রুত চালাচ্ছিল। হঠাৎই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা গিয়ে ধাক্কা মারে একটা গাছে। পরে আমরা ছুটে গিয়ে দেখি, সে মাটিতে পড়ে আছে-রক্তে ভেসে যাচ্ছে।”
এ যেন এক সিনেমার ক্লাইম্যাক্স-কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি নির্মম। পারভেজকে দ্রুত ঢাকা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সময় আর সাড়া দেয়নি।
একটি হেলমেট কি জীবন দিতে পারত না?
প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু উত্তরটা হৃদয়বিদারক-পারভেজের মাথায় কোনো হেলমেট ছিল না। দুর্ঘটনার আকস্মিকতা ও গতির তীব্রতায় মাথায় মারাত্মক আঘাতই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
আমরা কি সেই নিরাপত্তার সরঞ্জামটি তাকে দিতে পারতাম না? আজ তার মা-বাবা, শিক্ষক কিংবা বন্ধুরা কেউই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না-শুধু একরাশ কান্না তাদের চোখে জমে আছে।
একটি মৃত্যুর দায় কার?
মোটরসাইকেল চালানো কি কিশোরদের অধিকার? না কি এটি আইন লঙ্ঘনের একটি পরিচিত অথচ উপেক্ষিত চিত্র? বাংলাদেশে কিশোরদের হাতে মোটরসাইকেল উঠে যাওয়া এখন যেন "স্বাভাবিক" ঘটনা। অথচ আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কারো মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ।
তবুও কিশোররা রাস্তায়, বেপরোয়াভাবে ছুটছে-পেছনে নেই কোনো লাইসেন্স, সামনে নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ।
স্কুলের এক ব্যর্থ বিকেল ও সমাজের ব্যর্থতা
ধনাগোদা স্কুল অ্যান্ড কলেজে আজ নেই সেই চিরচেনা কোলাহল। সহপাঠীরা নিশ্চুপ। শিক্ষকরা বোবা কান্না নিয়ে তাকিয়ে আছেন ফাঁকা বেঞ্চটির দিকে-যেখানে পারভেজ বসত।
এই একটি মৃত্যু যেন প্রশ্ন তোলে, আমরা কি কেবল নিয়ম লিখে থেমে যাচ্ছি? নাকি তার প্রয়োগে ঘাটতি আমাদের এমন মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
যে পরিবার আজ কেবল একটা ছবি আঁকড়ে বাঁচবে
পারভেজের পরিবারে এখন শুধু স্মৃতি। মোবাইলে তোলা শেষ সেলফি, স্কুলের পরিচয়পত্র, কিছু পুরোনো খাতা-এইসবই হয়তো এখন তার মা-বাবার অস্তিত্বের একমাত্র অবলম্বন।
শুক্রবার রাতে জানাজা শেষে তাকে যখন পারিবারিক কবরস্থানে শোয়ানো হয়, তখন আকাশের তারা যেন আরও নিভে গিয়েছিল।
শেষ কথায় প্রশ্ন নয়,দায়বোধ
এই প্রতিবেদন প্রশ্ন তোলে না, বরং স্মরণ করায়-প্রত্যেকটি বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো কিশোরের পেছনে একটি পরিবার থাকে, একটি স্বপ্ন থাকে, একটি সমাজ থাকে।
একটি হেলমেট, একটি নিয়ন্ত্রণ, একটি সচেতনতা হয়তো আরও অনেক পারভেজকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে।