অর্থনৈতিক ধীরগতিতে বিপন্ন প্রান্তিক মানুষ: দারিদ্র্যসীমার নিচে নামতে পারে আরও ৩০ লাখ বাংলাদেশি

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • ২০২৫-০৪-২৪ ১৯:৫১:৩৬
image

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের খাঁচায় বন্দী হতে পারেন-এমন এক কঠিন পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বুধবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ হতাশাজনক চিত্র।
বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথগতি, শ্রমবাজারের অস্থিরতা ও প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। ফলে, যারা এখনো টিকে আছেন দারিদ্র্যসীমার ওপর, তারাও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছেন।

গতি হারানো অর্থনীতি, হুমকির মুখে আয় ও জীবিকা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক অর্থনীতি যেমন মন্থর হয়ে পড়েছে, তেমনি চাকরি খাতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশের প্রায় সকল খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে ধীরগতি বিরাজ করছে। ফলে শ্রমজীবী ও ক্ষুদ্র আয়ভিত্তিক পেশাজীবীরা আয়ের নিরাপত্তা হারাচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে-এই ধীরগতির প্রভাব বেশি করে অনুভূত হবে প্রান্তিক ও ঝুঁকিতে থাকা জনগণের ওপর। অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়বে, সমাজে বিভাজন গভীরতর হবে।

দারিদ্র্যের চক্রে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে লাখো পরিবার
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক আয় যদি ২ দশমিক ১৫ মার্কিন ডলারের নিচে হয়, তবে একজন মানুষকে হতদরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশে এ হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে, ২০২৪ সালের মধ্যেই এই হার ২২.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?
বিশ্বব্যাংক এর পেছনে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করেছে—
মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার অবনতি: খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার বহন করতে অসহনীয় করে তুলেছে।
বিদেশি মুদ্রার সংকট ও আমদানি ব্যয়: ডলার সংকটের ফলে আমদানিনির্ভর উৎপাদন খাতে ধস নেমেছে, যার ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে।
রপ্তানি খাতে শ্লথগতি: গার্মেন্টসসহ প্রধান রপ্তানি খাতে অর্ডার কমে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
অপ্রতুল সামাজিক সুরক্ষা ও দুর্বল নীতিনির্ধারণ: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তা কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পৌঁছায় না।

জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও ম্লান সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংক তার দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট: ট্যাক্সিং টাইমস’-এ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে মাত্র ৩.৩ শতাংশে। এটি গত জানুয়ারির পূর্বাভাস (৪.১ শতাংশ) থেকেও কম। পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৫) এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তা হবে ৪.৯ শতাংশ-যা বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় অত্যন্ত নিচু।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

সমাধানের পথ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংকট মোকাবেলায় সরকারকে নিতে হবে কয়েকটি তাৎক্ষণিক ও মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ:
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বিস্তৃত ও কার্যকর করা
দারিদ্র্য নিরসনে লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক বরাদ্দ বৃদ্ধি
গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি
শ্রমবাজারে দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন খাত সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ
প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা

বিশ্বব্যাংক অবশ্য আশা দেখিয়েছে-যদি কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারবে। তবে এর জন্য সময়োপযোগী, কার্যকর ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।