ভারতের স্বাধীনতায় মুসলিমদের অবদান

  • জাহাঙ্গীর বাবু
  • ২০২৫-০৪-১৯ ১২:৪০:৩২
image

ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রাম ছিল একটি সম্মিলিত প্রয়াস, যেখানে সব সম্প্রদায় এবং পটভূমির মানুষ একত্রিত হয়েছিল একটি সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে মুসলিমদের অবদান এবং আত্মত্যাগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা জাতির মুক্তির প্রতি তাদের অটুট প্রতিশ্রুতির সাক্ষ্য বহন করে।

 ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ
১৮ শতকের শুরুতেই প্রতিরোধের বীজ রোপিত হয়েছিল, যেখানে মাইসোরের নেতা 'হায়দার আলি' এবং তার পুত্র 'টিপু সুলতান' ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই করেছিলেন। "মাইসোরের বাঘ" নামে পরিচিত টিপু সুলতান ব্রিটিশদের হুমকিকে প্রথম স্বীকার করেন এবং তার রাজ্য রক্ষার জন্য সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন। টিপু সুলতানের যুদ্ধাস্ত্রে লোহার আবরণযুক্ত রকেট ব্যবহারের উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ করেছিল।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধের সময় মুসলিমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। 'বাহাদুর শাহ জাফর', শেষ মুঘল সম্রাট, এবং 'বেগম হযরত মহল' ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। বিশেষ করে বেগম হযরত মহল আওধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। চিনহাটের যুদ্ধে তার নেতৃত্ব বিদ্রোহের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল।

উল্লেখযোগ্য মুসলিম মুক্তিযোদ্ধারা
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ:
একজন বিদ্বান এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা, আজাদ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দৃঢ় সমর্থক ছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আশফাকুল্লাহ খান: কাকোরি ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত একজন বিপ্লবী, আশফাকুল্লাহ খান তার ভূমিকার জন্য ফাঁসি কার্যকর হন এবং মাত্র ২৭ বছর বয়সে শহীদ হন।

খান আব্দুল গফফার খান: "সীমান্ত গান্ধী" নামে পরিচিত, তিনি মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অহিংস খুদাই খিদমতগার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

পরিসংখ্যানের ভাষায়
ঐতিহাসিক নথি অনুসারে, ভারতের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী যোদ্ধাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম ছিলেন। ধারণা করা হয় যে মোট মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় '৬৫% মুসলিম', যা সে সময় তাদের জনসংখ্যার তুলনায় একটি অসাধারণ চিত্র। তাদের অবদান কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেছিল, যেমন 'মেমন আব্দুল হাবীব ইউসুফ মারফানি' পুরো সম্পদ স্বাধীনতা সংগ্রামে দান করেছিলেন।

বিস্মৃত নায়িকারা
স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলিম নারীদের আত্মত্যাগ প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। 'আবাদি বানো বেগম (বি আম্মা)' এবং অসংখ্য নামহীন নারী যাঁরা প্রতিবাদ, পিকেটিং এবং বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের সাহস এবং নিষ্ঠার জন্য স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহেই 'মোট ২২৫ মুসলিম নারী' তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ঐক্যের উত্তরাধিকার
মুসলিম মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সংহতির চেতনাকে তুলে ধরে। তাদের গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যা ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক সীমারেখা অতিক্রম করেছিল।

 সমকালীন মুসলিম বাস্তবতা
ইতিহাসে মুসলিমরা ভারতের স্বাধীনতায় বৃহৎ অবদান রাখলেও, যুগে যুগে তারা নির্যাতিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, ওয়াকফ আইন পাশ করে মসজিদ ও মাদ্রাসা ভাঙ্গা হচ্ছে। কর্মস্থল, যানবাহন, এমনকি বাজারে মুসলিম নারী ও পুরুষকে অপদস্থ ও নির্যাতন করা হচ্ছে। জোরপূর্বক "জয় শ্রীরাম" বলানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছোটখাটো ইস্যুগুলো ভারতীয় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায়। তবুও বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের হিন্দু ভাই-বোনেরা পরিবার ও সমাজে সম্পূর্ণ নিরাপদে বাস করছে।
বিশ্বের বিবেক যেন মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে বরাবরই অন্ধ ও বধির। শান্তি বজায় রাখতে প্রভাবশালী ও উন্নত দেশগুলির উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

লেখকঃ সমাজকর্মী,কলাম লেখক।
১৯ এপ্রিল ২০২৫