বা দ ল সৈ য় দ

  • বাবার ডাঁটভাঙা চশমা এবং মেয়েটির গল্প
  • ২০২৫-০৪-১৩ ২৩:৪৬:০৩
image

২০১৫ সাল। প্যারিস গিয়েছি একটি ওয়ার্কশপে যোগ দিতে।সেখানেই আফ্রিকান মেয়ে আদানা ওগুম্বার সাথে পরিচয়।এত প্রাণচঞ্চল মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।সারাক্ষণ ঠা ঠা করে হাসছে। প্রথম দর্শনেই বন্ধুত্ব হয়ে গেলো।'ফ্রেন্ডশিপ অ্যাট ফার্স্ট সাইট' বলা যায়।মিটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আমরা কফি ব্রেকে আড্ডা দেই।একসাথে লাঞ্চ করি।বিকেলে দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে সাবওয়েতে যাই, তারপর যার যার হোটেলে ফিরি।এভাবেই দেখতে দেখতে ছয়দিনের ওয়ার্কশপ শেষ হয়ে এলো।বিদায়ী সেশনে দুজনেরই মন খারাপ।কাল যার যার দেশে ফিরে যাব।আর কখনো দেখা হবে কিনা জানি না।
বিকেলে বিদায়ী অধিবেশনে লাঞ্চ ব্রেকে আদানা বলল, আচ্ছা, 'তুমি তো চশমা পরো।ছেলেদের চশমার খুব দামি একটা ব্র‍্যান্ডের নাম বলো তো।আমার বাবার জন্য কিনব।' আমি বললাম, 'কিছু মনে করো না, তোমার বাজেট কত?' সে উত্তর দিলো, 'দেড় হাজার ডলার।'
আমি অবাক হয়ে বললাম, 'বলো কী! এ দামে তো মনে হয় তুমি কার্টিয়ার ফ্রেম পাবে।' সে মৃদু হেসে বলল, 'তাহলে সেটাই কিনব। তুমি কি আমার সাথে যাবে?'
'নিশ্চয়', আমি উত্তর দিলাম।
কনফারেন্স শেষ হওয়ার পর দুজনে অনেক খুঁজলাম। তারপর আদানা পছন্দ করে চৌদ্দশ ডলার দিয়ে একটি কার্টিয়ার চশমা কিনল।সেটি কেনার পর আফ্রিকান মেয়েটির চেহারায় যে তৃপ্তি দেখলাম, সেরকম তৃপ্তি আমি খুব কম দেখেছি।
কেনাকাটা শেষে দুজনে হেঁটে সাবওয়ের দিকে যাচ্ছি।আমার বেশ কৌতূহল হচ্ছে, এত দামি চশমা সে কেন কিনল? যেন সে আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বলল, 'আমার মা সবচে ছোট ভাইয়ের জন্মের সময় মারা যান।আমাদের মানুষ করেছেন বাবা।তিনি কাজ করতেন একটি পামওয়েল কারখানায়।পিউর শ্রমিক যাকে বলে তিনি ছিলেন তাই।দারিদ্র কত ভয়াবহ তা আমাদের ছয় সদস্যদের পরিবারের তখনকার অবস্থা দেখলে তুমি হাড়ে হাড়ে টের পেতে।তারপরও আমার বাবা তাঁর পাঁচ ছেলেমেয়েকেই পড়িয়েছেন।মানুষ করেছেন। কোন সময় পড়িয়েছেন জানো? যখন তাঁর সহকর্মীরা এমনকি রোজগারের জন্য নিজ কন্যারা সম্মান বিক্রি করলেও না বোঝার ভান করতেন।আমি আমার বাবাকে কখনো পেট পুরে খেতে দেখিনি, কিন্তু তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভারটাইম খেটে আমাদের পড়া এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন।একবার হাত থেকে পড়ে তাঁর চশমার একটি ডাঁট ভেঙে গেলো।তিনি নতুন চশমা কিনতে পারলেন না।সারাজীবন ভাঙা ডাঁটের বদলে সেখানে সুতো লাগিয়ে সেটি ব্যবহার করেছেন।সেই সুতো লাগানো চশমা যতবার দেখতাম ততবার আমার কান্না আসতো।তখনই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি আমার বাবাকে দুনিয়ার সবচে দামি চশমাগুলোর একটি কিনে দেবো। সে জন্য আমি অনেক দিন ধরে টাকা জমিয়েছি।' বলতে বলতে আদানা ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল।
আমি তার হাত ধরে বলতে চাইলাম, 'প্লিজ, কেঁদো না।' বলতে পারলাম না। এ কান্না থামানোর ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু শক্ত করে তার হাত ধরে রইলাম।সে টিস্যু বের করে চোখ মুছতে মুছতে বলল, 'আমার নাম 'আদানা'- এর অর্থ জানো?' 
আমি বললাম, 'জানি না।'
সে বলল, 'ফাদার'স ডটার।আমার নামের অর্থ হচ্ছে, বাবার কন্যা। রাজকন্যা।'
আমি তার হাত আরো জোরে আঁকড়ে ধরলাম।কেন জানি আমারও আব্বার কথা মনে পড়ছে। কান্না আসছে।
পৃথিবীর সব বাবাই আসলে এক  এবং অভিন্ন।