কয়েকটি ফরমায়েশ রয়েছে । ফরমায়েশের ইংরাজি কী ওর্ডার ত, নাকি ? হ্যাঁ , কি ফরমায়েরশ ? লেখার ফরমায়েশ । তা আজ সারাটা দুপুর বিকেল সন্ধা জুড়ে পিঠ টান টান করে লিখেই যাচ্ছি কাগজ কলম নিয়ে । ঝড়ের বেগে লিখে যাচ্ছি। আমার চেয়ার টেবিলে বসে । সেই দুপুর থেকে । রাত এ'পর্যন্ত । কি লিখছি ? জানি না ত ! ফরমায়েশি লিখা , তাই লিখছি । এর মধ্যে কয়েকটা সিগারেট পান করেছি । যতই সিগারেট স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন থাকুক না কেন এই পচা জিনিসটা মানুষ যেখানে সেখানে আকছার টেনেই যাচ্ছে । এতে পয়সা এবং স্বাস্থের কি যেন বলে কি যেন বলে ? যাক গে । মনে মনে ভাবলাম রাত কত হল এখন ? ও ! মনে পড়েছে ।
একটানা বসে থাকাতে পিঠটা টন টন করছে । ক'দিন ধরে বুকটাও চিন চিন করে ব্যথা করছে । মাথাটা ঝিম ঝিম করছে । এবং ঘাড়ে বেশ ব্যথা । ঘাড় ঘুরাতে পারি না ব্যথায় । জানি না এসব কিসের আলামত । এখুনি কেউ বলে বসবেন সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেও সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে । কেউ বলবে এখুনি ডাক্তার দেখাও । আচ্ছা সে সবে পড়ে আসছি । এখন বলছি একটানা ফরমায়েশি লিখা চালিয়ে যাবার ফলে চোখে পিচুটি জমেছে । ময়লা রুমাল দিয়ে পিচুটি মুছেছি । সামনে পানির জগ আর একটি গ্লাস রয়েছে । অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পানি পান করছি পেট ভরে ।
সেই দুপুরে ভাত খেয়েছি । শুধু কি ভাত ? ডাল , আলু ভর্তা এবং ভাত । তিন আইটেম । তিন আইটেম দুই ভাবে খেয়েছি । প্রথমে শুধুমাত্র আলু ভর্তা দিয়ে । পরের বার ডালের সাথে আলু ভর্তা মিশিয়ে খেয়েছি । বেশ মজা লেগেছে । বিকেলে একটি লম্বা টোস্ট বিস্কুট , বলে নেই বাজারে এখন নিয়মের বাইরে একটি কোম্পানি টোস্ট বিস্কুট ছেড়েছে যা লম্বায় ছয় সাত ইঞ্চি ! একটিতেই কাফি । মানে পেট ভরে যায় । মজা লাগুক কি চাই না লাগুক । সাথে চা । তবে দুই বার খেয়েছি ।
রেবেকা , মানে আমার স্ত্রী অনেকবার বাঁধা দিয়েছেন মানে চেষ্টা করেছেন । বলেছেন , " তোমার চোখের অসুখ, মাথা ব্যথা , শরীর খারাপ ক'দিন আগে জ্বরে ভুগে উঠলে । এখন রাখ তো তোমার ফরমায়েশি লেখা । চল এখন শোবে । "
হেসে সান্তনা দিয়ে বলেছি , " লক্ষ্মীটি , তুমি শুয়ে পড় , আমি আসছি আর কিছুক্ষণ পরে ।"
বউ একটু মন খারাপ করে বলে , "আমি এই যাচ্ছি । তুমি কিন্তু আর দেরী কর প্লিজ !"
সকালে বাইরে গিয়েছিলাম --- যথানিয়মে , প্রতিদিনের মত । পরিচিতদের দেখা দিয়ে এসেছি । প্রতিদিন দুটি কাজ আমাকে করতে হয় । একটা চাকুরী খোঁজা এবং কিছু টাকা ধার করা । এতক্ষণে কেউ কেউ বুঝে নিয়েছেন আমার অবস্থা কোন দিকে আছে ।
পত্র - পত্রিকার অফিসে ঢু মেরে এসেছি । লেখার ফরমাশেয়ের ( ওয়ার্ডার ) নিতে । পেয়েছি কয়েকটা । পাওয়ানা চেয়েছি আগের লেখাগুলোর জন্য । চেয়েছি মাত্র অমনি অবাক চোখে আমাকে নতুন করে দেখছেন যেন , আবার কেউ ভেংচি মেরে বলেছেন , " যান ত সাহেব এখন , বড্ড ব্যস্ত আছি । আট দশদিন পরে আসবেন । তখন দেখা যাবে কি করা যায় । কেউ বা জিজ্ঞেস করেন , " এটা কি মাস লেখক সাহেব ?"
বলেছি ," জ্বি , মার্চ মাস "
" ও ! ইয়ার এন্ডিং চলছে না ? যান যান এখন ম্যালা ভ্যান ভ্যান করবেন না । ইয়ার এন্ডিং নিয়ে খুব ব্যাস্ত আছি । বেশী ব্যস্ত । "
আবার কেউ বা বলেছেন," এটাই আপনাদের দোষ সাহেব । সাহিত্য করছেন । কত সম্মানিত কাজ । এর সাথে পয়সার কোন সম্পর্ক নেই অথচ তার বিনিময়ে পয়সার জন্য ফ্যা ফ্যা করছেন । এজন্যই আমাদের সাহিত্যের উন্নতি নেই । নাহ -- কোন আশা নেই । যে দেশের সাহিত্যিকেরা সাহিত্য বিক্রি করে -- সে দেশের ভবিষ্যৎ রীতিমত অন্ধকার । যাকে বলে ঝরঝরে ইতাদি । কতশত বকবকানি আর উপদেশ । সব সহ্য করতে হয় ।
উত্তরে অনেক কিছু বলতে পারতাম । কিন্তু বলিনি । বলে কি লাভ ? বরং আমারি ক্ষতি । যাও দু'পয়সা লিখে পাওয়ার দরোজাটা এখনও খোলা আছে --- মুখে মুখে তর্ক করার ফলে ( যুক্তি - ফুক্তি নয় তাঁদের কাছে তা তর্ক । ক্ষমাহীন বেয়াদপি ) সে রাস্তাটা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে । তাই চুপ মেরে গেলাম । সবাই তাই করে । আমি এমনটি একা নই । আরও অনেকেই আছেন এই লাইনে ।
আগে এরকম অনেকবার হয়েছে , এখন ঠকে শিখেছি । ভুক্তভোগী হয়ে তর্কের অভ্যাসটা ত্যাগ করেছি । বরং বত্রিশটা দাঁত বের করে বলি , যা বলেছেন স্যার । হে হে হে স্যার খুব দরকার ছিল , দরকার না হলে আপনাকে বিরক্ত করতাম না । আচ্ছা আমি না হয় পরেই আসবক্ষণ স্যার এসব ব্যক্তিগত কথা ।
রীতিমত পরচর্যা । নিজের পায়ে কুড়ল মারা তাও আবার নিজের হাতে ।
অতএব বন্ধুরা অন্য কথা বলি --- এই আশি সনের বৈশাখী দুপুরবেলা মাথা ফাটা রোদে হেঁটে হেঁটে গুলিস্তান থেকে কলাবাগানে বাসায় এসেছি । এসেই আলু ভর্তা এবং ডাল দিয়ে ভাত খেয়েই চেয়ার টেবিলে বসেছি ।
আগেই বলেছি ---কয়েকটি ফরমায়েশি লিখার ওয়ার্ডার পেয়েছি । কালকে সকালেই গিয়ে দিয়ে আসতে হবে । রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের উপর কয়েকটি লিখা । কয়েকটি বিজ্ঞাপনের মুসাবিদা ইত্যাদি ।
সকালে আবার একটা ক'টাকার টিউশনি আছে । আগামী পরশু থেকে আমার ছাত্রের এস এস সি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে । আগামীকাল সেই ছাত্রের বাসায় যেতেই হবে , সকালেই । পরীক্ষার আগের দিন একটু বেশী বেশী পড়াতে হবে মানে দেখতে হবে সে ঠিক মত শিখেছে কিনা । এটি আবার ছাত্রের গার্জেনের কড়া নির্দেশ ! তাই দশটা এখানেই বাজবে মানে ছাত্রের বাসায় । সেখান থেকে যেতে হবে পত্রিকা অফিসে ।
তাই আজকের রাতের মাঝেই লিখা কটা শেষ করতে হবে । লিখাগুলো না দিলে সম্পাদক সাহেব খুব রেগে যাবেন । তাতেই আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে চিরতরে । এই লিখা আমি ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি । আর সময় মত লিখা না দিলে পয়সা পাওয়া যাবে না । যদিও পয়সা দেবার সময় তারা খুব গড়িমসি করে । তবে এক সময় দিয়ে দেয় । এটাই আশারবানী ।
হ্যাঁ , তাই সেই দুপুর থেকেই কলম কাগজ চেয়ার টেবিলে যুক্ত আছি । চালিয়ে যাচ্ছি বেঁচে থাকার সংগ্রামে । ক'টা টাকা অর্জনের চেষ্টায় এ' সংগ্রাম ।
লিখাগুলো আজকের রাতেই শেষ করতে হবে । যে করেই হোক ।
হ্যারিকেনের তেল কি কমে এসেছে ? টিম টিম করছে কেন ? রান্নার ঘরে কেরোসিনের চুলায় তেল রয়েছে । সামান্য কিছু তেল ঢেলে নিলাম হ্যারিকেনের পেটে ।
উঃ কোমরে পীঠে ঘাড়ে অসম্ভব ব্যাথা । মাথাটা টিক টিক করছে । রাত কত হল ?
আগামী কয়েক দিন পরে পঁচিশে বৈশাখ । বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্র ঠাকুরের শুভ জন্ম দিন । এর কয়েকদিন পরে এগরই জৌষ্ঠ বিদ্রোহী বুলবুল কবি নজরুলের শুভ জন্মদিন । রবীন্দ্র এবং নজরুলের উপর কিছু লিখতে হবে , আজকে তাই লিখছি । সম্পাদকদের ফরমায়েশ মাফিক ।
হে কবিবর --- রবী ঠাকুর , হে কবিবর --- নজরুল আমাকে তোমরা ক্ষমা কর । তোমাদের সম্পর্কে আমি কতটুকুই বা জানি । অথচ এই লেখা তোমাদের সম্পর্কেই লিখছি ঝড়ের বেগে ! পাতার পর পাতা । দিন রাত এক করে ।
জিজ্ঞেস করবে , " কেন ? কেন তবে লিখছ ব ৎস ?"
" কারণ আমার চাকুরী নেই । আমি বেকার । আমি সংসারী মানুষ । ঘরে আছে ছয়জন খানেওয়ালা । তাছাড়া চারজন পড়াশুনা করছে ওদের সব খরচ । আরও আছে -- দিন কাল যা পড়েছে -- বাজারে আগুন ধরেছে ( অগ্নিকান্ড নয় ) , জিনিস পত্রে হাত দেওয়া যায় না । চাকুরী যে একটা ছিল না বা করতাম না তা নয় । সওদাগরি অফিসের চাকুরী । বিনা নোটিশে ছুটে গেল সেই চাকুরী । পথে বসিয়ে দিল আমাকে । তাতে সেই সওদাগর সাহেবের কিছু যায় বা আসে না । নুতন চাকুরী খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে মরছি কিন্তু পাচ্ছি না । যেখানেই যাই " নো ভ্যাকেন্সি " লটকে আছে ! তাই -- আটজনের প্রতিদিন ক্ষুধা তৃষ্ণার বিনিময়ে , বেঁচে থাকার বিনিময়ে , বাঁচার প্রয়োজনে তোমাদের সম্পর্কে ফরমায়েশি লেখা লিখছি । লিখছি ঝড়ের গতিতে । বিশ্বাস কর --- হে কবিবর আমি সাহিত্য করতে আসিনি । সাহিত্যিক হবার দুঃসাহস আমার ভেতরে কখনোই ছিল না । এখনো নেই । ব্যস --- দুদিনের জন্য বেঁচে থাকার জন্য -- সাহিত্যের নামে --- তোমাদের ভাঙ্গিয়ে খেয়ে পড়ে বাঁচার জন্য কলম পিষছি এবং লিখছি এই এত রাত ধরে । যেখানে সুন্দরী স্ত্রীর পাশে ঘুমিয়ে পড়ার কথা !
হে কবিবৃন্দ --- তোমরা মহান । সুন্দর । হৃদয়বান । তোমরা নিজ গুণে এই অদমকে ক্ষমা করে দেও ।
একটা সিগারেট দরকার !
আর যে নেই । শেষ হয়ে গেছে । ভাই ভাই ! এখুনি আবার বলে বসবেন না , ব্যাটা নকলিবাজ লেখক ঘরে যে এতো অভাব ! তোমার আবার একটু পর পর সিগারেটের নেশা চেগায় কেন ? কি করব ভাই অনেকদিনের রপ্ত করা বদ অভ্যাস ।
সিগারেট নেই ! মোড়ের দোকানটা অনেক আগেই মনে হয় বন্ধ হয়ে গেছে । কিন্তু খোলা থাকলেও বাকী দেবে কি সে ? কেন দিবে ? আগেরই অনেক ধার জমেছে । সকালে পাওয়ানাদারেরা সব ভিড় করেছিল । বলেছিলাম বিকেলেই সব শোধ করে দেব । সে বিকেল আর আর না ।
রেবেকা -- আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে একঘুম দিয়ে উঠে এসে বলছিলেন," এই কি করছ ? এত রাত ধরে ? ঘুমাবে না ? এসো না ।"
" লিখছি গো ! তুমি ঘুমাও , আমার হয়ে এসেছে আর বেশী নেই ।"
" কি লিখছ ? রাত এখন কত জান ?"
" জানি না ত , তবে রাত অনেক হয়েছে এইটুকু বুঝতে পারছি । তুমি বরং ঘুমিয়ে পড় । তোমাকে ত আবার খুব সকাল সকাল উঠতে হয় । আমি যাচ্ছি এক ধর আধা ঘন্টার পর । "
স্ত্রী মনক্ষুণ্য হয়ে চলে গেলেন হাই তুলে তুলে ।
আমি আবার ঝাঁপিয়ে পড়লাম খাতার উপরে ।