পূর্ব প্রকাশিতের পর...
২।।
মুখের হাসি বদলায়নি এখনো । কি বিছিরি হাসি । আমার সারা শরীর ঘিন ঘিন করতে থাকে । আমাকে তিনি আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে , আমার মত তরুন যুবকদের রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের ঐশ্বার্য দেখানোটা তাঁর যেন একটা আনন্দ আর গর্বের বিষয় !
আমাকে হঠা ৎ ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, " তোমার বাবা কি করে ? " এ প্রশ্নটা না করাই উচিৎ ছিল,আমার কাছে মনে হল । যে সুন্দর পরিবেশে আমি ছিলাম, সেখানে এ প্রশ্নটা নিতান্ত বেমানান ! আমি জানালাম," আমার বাবা মৃত । তিনি জিজ্ঞেস করলেন" কি করে তার মৃত্যু হল ? ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়ে ? " উনার কথা শুনে আমি যেন একটা ধাক্কা খেলাম ।
বললাম," ঠিক তা নয় । মেশিনে আটকে গিয়েছিলেন ।
" ও ! ফ্যাক্টরিতে চাকরী করত বুঝি ?"
কথাগুলো এমনভাবে বলা হল যেন খুবই স্বাভাবিক । তাচ্ছিল্যের বদলে একটু সাহানুভুতির আশা করেছিলাম । বাবার থেতলে যাওয়া দেহটার কথা কল্পনা উনি একটু দুঃখ প্রকাশ করবেন , তার আশা করেছিলাম ।
" কোন ফ্যাক্টরিতে চাকরী করতো ?"
আমি ফ্যাক্টরির নামটা বলি । যেন কিছুই হয়নি , এমন করে বললেন, " ও ! ওটাত আমার ফ্যাক্টরি , আমিই ওটার মালিক । আরও চারটি আছে , কি নেই আমার ? কি ভাবে টাকা কামাই করতে হয় , তা আমি ভাল করে জানি । "
আমার শরীরে কে যেন চাবুক মারল , ফ্যাক্টরির মেশিনগুলো সব একসাথে খটর খটর করে বিকট আওয়াজ করছে । আমার কানের পাশেই যেন । না , আওয়াজ করছে না -- অট্টহাসি হাসছে । " তোর বাপকে নিয়ে উনিশজনকে খেয়েছি ! আমাদের ক্ষিদে এখনো মেটেনি --- আরও চাই -- আরও চাই ।"
আমার বাবার মৃত মুখটা ভেসে উঠে । আমাকে যেন বলছিলেন , " কেমন আছিস তোরা আমাকে ছেড়ে ? " আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না । কে যেন আমার গলার স্বর চেপে ধরেছে । বাবা যেন আরও জিজ্ঞেস করছে ন " তুই এখানে কেন ? কেন এসেছিস ? আমার হত্যাকারীর বাসায় তোর পা ঢোকার সাহস হল ?"
সব কিছু ঝেড়ে ফেলে আমি উঠে দাঁড়াই । ভদ্রলোক আমার দিকে চেয়ে আছেন । আমার মুখটা বিকৃত আকার ধারণ করল ,ভয়ংকর এক মুখ ! বিশ্রী কুৎসিত এক মুখ । শকুনে খাবলে খাওয়া মুখ ।
ভদ্রলোককে কোন সম্মান না করেই আঙ্গুল তুলে বলি , " তুমি একজন হত্যাকারী !"
লোকটা ঘাবড়ে গিয়ে বলেন," মিথ্যে কথা । ওটা একটা দুর্ঘটনা মাত্র ! ফ্যাক্টরিতে এমনটা প্রায় ঘটে থাকে । যার হয় তার বেখেয়ালির জন্যে হয়ে থাকে । আমাকে তুমি মিছে দোষ দিচ্ছ ! "
" দুর্ঘটনা নয় । তোমাদের লোভের ফসল । দেশের সব কিছু তোমরা নিয়ন্ত্রণ কর । মানুষের কষ্টের কারণ তোমরা , তোমার ফ্যাক্টরির জন্য আমার বাবা মারা গেল --- এক মাসের বেতন ছাড়া তুমি আর কিছু করনি , একবারও খোঁজ নিয়ে দেখনি তোমার কার্মচারির পরিবারটা এখন কিভাবে আছে ? তোমার জন্য আমি ফাইভ পাশ করে সিক্সে পড়তে পারিনি । ছোট ভাইটা অসুখে মারা গেল বিনা চিকিৎসায় । আমাদের কোন খবর রেখেছিলে ? তুমি নিষ্ঠুর - লোভী - নীচ । নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বুঝ না । তুমি হত্যাকারী । " আমি চেচিয়ে বলতে থাকি । আমার উচ্চস্বর স্বর শুনে গেইটের কাছে তিন চারজনকে দেখা গেল । তারা উদ্বিগ্ন চোখে আমাদের দেখছে ! লোকটার মুখ কিছুক্ষণ আগে পর্য্যন্ত বিদ্বেষ পুর্ন ছিল । কৃপার দৃষ্টি ছিল । গর্বে গর্বিক ছিল । নোংরা গলিতে ঢুকে মানুষের মুখ যেমন আকার ধারণ করে , তার মুখটাও কিছুক্ষণ আগে সেরকম ছিল । আশ্চার্য্য হবার পালা ওর । বিস্মিত হবার পালা ওর । এভাবে কেউ থাকে বলেনি কেউ কখনও ।
তিনি একগুয়ে গলায় বললেন ," না না না , আমি হত্যাকারী নই ।"
বললাম ," তুমি যদি তা না হও তাহলে তোমার কার্পেট লাল কেন ? তোমার সব কিছুতে লালের এতো মাখামাখি কেন ? তোমার বাগানে এতো লাল গোলাপ কেন ? "
ও জবাব দিতে পারল না ।
আমার অজান্তে আকাশে মেঘ জমে গেছে । ঘন কালো মেঘ । ঝড়ের পূর্বাভাস । গুরু গুরু গর্জন হচ্ছে থেমে থেমে । কিছুক্ষণ আগেও আকাশ পরিস্কার ছিল । ঘরের কাঁচের দেয়াল ভেদ করে দেখা গেল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে । বেশ বাতাস , গাছগুলি নুয়ে পড়তে চাইছে ।
আমি দরোজা দিয়ে বেড়িয়ে আসি ভিড় ঠেলে । ওরা আমার চলে যাবার রাস্তা দেয় । কোনরূপ বাঁধা দেয় না । তবে লোকগুলো খুব হিংস্র চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে । ওরা ত এই লোকের কিনা পোষ্য !
লোকটা বলে উঠে , " থেকে যাও -- ঝড় শুরু হয়ে গেছে !"
আমি তার কথা আমলে না নিয়ে বলি , " তোমার ঐশ্বার্য তুমি আমায় দেখালে কিন্ত আসলে ওটার কার ? কার রক্তে ? কার ঘামে ? আমার নিজের বাড়িতে আমি থাকি বা না থাকি তাতে তোমার কি ?"
লোকটা বলল," আমার ভয় করছে !"
তার কথা শুনে আমি একটু হাসি , বলি , " তোমার পাশে এতো লোক ! তারপরেও তোমার ভয় করছে ? "
বৃষ্টি আর ঝড়ের মাঝেই ভিজে ভিজে বাসার দিকে পা বাড়ালাম । অনেকটা পথ আমাকে যেতে হবে । ধানমন্ডি থেকে আজিম পুর ।