স্মরণ-ফতেহ লোহানী প্রতিভাধর এক বলিষ্ঠ অভিনেতা

  • মেসবা খান
  • ২০২৫-০৩-১২ ২০:৩১:১৬
image

চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ফতেহ লোহানীর জন্ম ১২ মার্চ ১৯২০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।
তাঁর পিতা আবু সাঈদ মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসেন খাঁ যিনি আবু লোহানী নামে অধিক পরিচিত একজন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ছিলেন।
তিনি তৎকালীন কলকাতার বিখ্যাত ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা 'দ্য মুসলমান' (১৯০৬) এর সহকারি সম্পাদক ছিলেন এবং মাতা ফাতেমা লোহানী ছিলেন কলকাতা করপোরেশন স্কুলের শিক্ষিকা ও লেখিকা।
মাত্র আট বছর বয়েসে পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর মায়ের তত্ত্বাবধানে কলকাতায় ছেলেবেলা ও শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয়।
লোহানী কলকাতার সেইন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রাল মিশন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, রিপন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। 
এরপরে ১৯৫০ এ তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান এবং ওল্ডভিক থিয়েটার স্কুলে নাট্য প্রযোজনা বিষয়ে দুবছরের কোর্স সম্পন্ন করেন। সে সময় ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সদস্য হিসেবে তিনি চলচ্চিত্র বিষয়েও অধ্যয়ন করেন।
কিশোর বয়সেই কলকাতায় মুকুন্দদাসের স্বদেশী যাত্রা দেখে মুগ্ধ হয়ে অভিনয়ের প্রতি অনুরাগী হন।
কলকাতার স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি প্রথম অভিনয়ের সাথে সম্পৃক্ত হন। তিনি কৌতুকাভিনয় ও আবৃত্তি করতেন। রিপন কলেজে পড়ার সময় লোহানী বেশকিছু বাংলা ও ইংরেজি মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন।
কলেজে অভিনীত তাঁর প্রথম নাটক বনফুল রচিত 'শ্রী মধুসূদন'। এ নাটকে তিনি মধুসূদন চরিত্রে অভিনয় করেন।
সেসময় তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো উৎপল দত্ত পরিচালিত 'হ্যামলেট' নাটক। এতে তিনি হ্যামলেটের পিতার ভূমিকায় অভিনয় করেন। 
পরবর্তীতে তিনি শৌখিন নাট্যগোষ্ঠী ও সাধারণ রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হন।
সেসময় তিনি সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি পরিচালনা ও এতে অভিনয় করেন। 'বাণী থিয়েটার' এর মঞ্চে 'রামের সুমতি' নাটকে কিশোর রামের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
পেশাদার নাট্যগোষ্ঠী ‘আলোক তীর্থ’ এর উদ্যোগে রঙমহল এ মঞ্চস্থ হেমেন রায়ের 'নর-নারী' নাটকে তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্রকার বিমল রায় ১৯৪৫ সালে তাঁর হিন্দি চলচ্চিত্র 'হামরাহী' এর একটি ছোট চরিত্রে তাঁকে অভিনয়ের সুযোগ দেন। এ চলচ্চিত্রে তিনি কিরণ কুমার নামে অভিনয় করেন।
একই বছরে তিনি উদয়ন চৌধুরী (ইসমাইল মোহাম্মদ) রচনায় ও পরিচালনায় 'জোয়ার' নাটকে অভিনয় করেন।
১৯৪৬ সালে হিমাদ্রি চৌধুরী (ওবায়েদ-উল হক) রচনা, প্রযোজনা ও পরিচালনায় 'দুঃখে যাদের জীবন গড়া' চলচ্চিত্রে প্রতিনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। 
ফতেহ লোহানী ১৯৪৭ সালে কলকাতায় অখিল নিয়োগী পরিচালিত 'মুক্তির বন্ধন' চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
দেশবিভাগের পরে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি চলচ্চিত্র নির্মানে এগিয়ে আসেন। ওই বছরেই তিনি 'আসিয়া' চলচ্চিত্রের নির্মান কাজ শুরু করেন।
পাশাপাশি পরিচালনা করলেন 'আকাশ আর মাটি' চলচ্চিত্রটি। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায়। 
এ চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে সুমিতা দেবী ও নায়ক হিসেবে প্রবীর কুমার ও আমিন অভিনয় করেন৷ এটি ছিল তাঁর পরিচালিত প্রথম পূর্নদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও এফডিসি থেকে নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র।
পরের বছর ১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর 'আসিয়া' চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রেও সুমিতা দেবী অভিনয় করেন। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ১৯৬০ সালে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ও পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সম্মানজনক 'নিগার পুরস্কার' লাভ করেন। 
ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে ফতেহ লোহানীর অভিষেক ঘটে ১৯৬৪ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত 'রাজা এলো শহরে' এর মাধ্যমে। 
এ চলচ্চিত্রে তিনি খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন ও এর মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। 
একই বছর বেবি ইসলাম পরিচালিত 'তানহা' উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৬৫ সালে তার পরিচালিত প্রথম উর্দু চলচ্চিত্র 'সাত রং' মুক্তি পায়। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান বাংলার প্রচলিত লোককাহিনী ও হিন্দু পুরাণ 'মনসা মঙ্গল' কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী অবলম্বনে 'বেহুলা' চলচ্চিত্রটি নির্মান করেন। এতে তিনি চাঁদ সওদাগরের ভূমিকায় অভিনয় করেন। 
ঐ বছর তিনি সৈয়দ শামসুল হক পরিচালিত আরেকটি উর্দু চলচ্চিত্র 'ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো' চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে লোহানী বিশের অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। 
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - আগুন নিয়ে খেলা, দরশন, জুলেখা, এতটুকু আশা, বাল্যবন্ধু, মোমের আলো, মায়ার সংসার, মিশর কুমারী, তানসেন, আঁকাবাঁকা, অন্তরঙ্গ, ঘূর্ণিঝড়, স্বরলিপি, দর্পচূর্ণ, দীপ নেভে নাই, অপবাদ, পিতাপুত্র প্রভৃতি। 
মনে পড়ে তার অভিনীত 'দরশন' ছবিতে শবনমের বিত্তবান পিতার চরিত্র, 'এতটুকু আশা' তে সাদা সিধে রাজ্জাক-রোজীর অধ্যাপক পিতার কথা, কিম্বা 'দর্পচূর্ন'র দাম্ভিক জমিদারের চরিত্রে স্মৃতি জাগানিয়া বলিষ্ঠ অভিনয়ের কথা।
১৯৭৫ সালের ১২ এপ্রিল কাপ্তাইয়ে কাজী আনোয়ার হোসেনের রহস্য উপন্যাস অবলম্বনে 'কুয়াশা' ছবির শ্যুটিং চলাকালীন আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হন। শ্রদ্ধাঞ্জলি।