আজ তাঁর বিয়াল্লিশতম প্রয়াণ দিবস। তবে কে-ই বা মনে রেখেছে তাঁকে এখন সেভাবে!
সবার কাছেই তিনি কমেডিয়ান, কিন্তু অনেক নামজাদা অভিনেতাও তাঁর অভিনয় দক্ষতার কাছে বেগ পেয়েছেন।
একসময় সেভাবে কাজ না পেলেও, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেননি, যাত্রা করেছেন সংসার চালাতে। আসলে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার যে উপাদান, তা আমরা নিয়ে জন্মাই। পরে তা শানিত হয়।
সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায় যখন জন্মেছেন, তখনই ওঁর মধ্যে উপাদানগুলো শানিত ছিল। ওকে যারা কমেডিয়ান বলতেন, তাদের কাছে অন্য শব্দ ছিল না।
সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায় কমেডিয়ান নন। তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনেতা। ভাবছেন সাম্যময় আবার কে ?
তিনি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা। বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যকৌতুকময় অভিনয়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দিকপাল।
আসলে কমেডিয়ান হতে গেলে সব দিক পরিক্রমা করে আসতে হয়। যিনি হাসাতে পারেন, তিনি দর্শকের চোখে জলও আনতে পারেন। যেমন চার্লি চ্যাপলিন।
দেখে হাসছেন, কিন্তু কখন যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়বে, বুঝতে পারবেন না। ভানু বন্দোপাধ্যায় তেমন। এছাড়াও আচার্য সত্যেন বোসের অতি প্রিয় ছাত্র ছিলেন সাম্যময়।
জন্ম অবিভক্ত বাংলার মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর পরগনায় ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট।
ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি’স হাইস্কুল এবং জগন্নাথ কলেজে শিক্ষা শেষ করে কলকাতায় যান ১৯৪১ সালে।
সেখানে তিনি আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি নামে একটি সরকারি অফিসে যোগ দেন এবং বালিগঞ্জের অশ্বিনী দত্ত রোডে তাঁর বোনের কাছে দু’বছর থাকার পর টালিগঞ্জের চারু এভিভিন্যুতে বসবাস শুরু করেন।
১৯৪৭ সালে তাঁর প্রথম সিনেমা 'জাগরণ' ও 'অভিযোগ'।
তারপরে প্রত্যেকটি বছরই তিনি অনেকগুলো সিনেমা করে আমাদেরকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল - মিস প্রিয়ংবদা, পাশের বাড়ি, মহারাজা নবকুমার, ওরা থাকে ওধারে, দস্যু মোহন, একটি রাত, ভানু পেলো লটারী, যমালয়ে জীবন্ত মানুষ, কাল তুমি আলেয়া, গল্প হলেও সত্যি, আশিতে আসিও না, চৌরঙ্গী, বাঘিনী, সাগিনা মাহাতো। কবি, প্রিয় বান্ধবী, নন্দিতা, অসাধারণ, দেবদাস, প্রেয়সি, শহর থেকে দূরে, এবং সর্বশেষ চলচ্চিত্র শোরগোল।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস খুব স্নেহ করতেন এই বুদ্ধিমান কিশোরকে, তাঁর জন্মদিনে বাঘা বাঘা বৈজ্ঞানিক বন্ধুরা যখন বাড়িতে আসতেন।
এই ছেলেটির কৌতুক নকশা শুনিয়ে জ্ঞানীগুণী অধ্যাপককে বসিয়ে রাখতে পারতেন অন্তত ঘন্টাখানেক।
আমৃত্যু অধ্যাপক বোসের এই ভালোবাসা অটুট ছিল।
কবি মোহিতলাল মজুমদার, কবি জসিমউদ্দিন, রমেশচন্দ্র মজুমদার মাস্টারমশাইদের স্নেহ ভালোবাসা নিয়ে তিনি খুব গর্ব করতেন।
সমাজতন্ত্রের আদর্শে তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল। গর্ব করে বলতেন আমার মায়ের বাবা আমার নাম রেখেছিলেন সাম্যময়। তিনি বলতেন 'আই এ্যাম এ কমিউনিস্ট , আই বেয়ার ইট ইন মাই নেম'।
অবশেষে কিংবদন্তি এই শিল্পী ৪ মার্চ ১৯৮৩ সালে মহাকালের ডাকে পাড়ি জমান পরপারে। আর সেই সাথে অবসান ঘটে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অধ্যায়ের। শ্রদ্ধাঞ্জলি।