মৃণালিনী দেবী

  • সকালের আলো প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০২-১৯ ০০:৫০:২৩
image

মৃণালিনী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনসঙ্গিনী—একজন স্ত্রীর ভূমিকার চেয়ে অনেক বেশি। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জীবনের নীরব প্রেরণা, একজন গভীর হৃদয়ের সঙ্গী। কিন্তু তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ছিল মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর আগে সেই গভীর রাতে।
মৃণালিনী দেবী জীবনের শেষ সময়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এতদিন সবাই কবি রবীন্দ্রনাথকে চেয়েছে, কিন্তু আমি শুধু মানুষ রবীন্দ্রনাথকেই চেয়েছিলাম। তার কাছে কবি ছিলেন নদীর সাগর কিংবা পাখির আকাশের মতো, অন্তহীন এবং অমূল্য। কিন্তু মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তার হৃদয়ের আকুলতা ছিল রবীন্দ্রনাথকে আবার একবার কবি হিসেবে অনুভব করার।
সে রাতে প্রকৃতি ছিল এক গভীর অস্থিরতায় ভরা। ঝড়ের তীব্রতা যেন মৃণালিনীর অন্তরের অশান্তি প্রতিফলিত করছিল। সেই আবহে তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করলেন সেই গানটি গাইতে, যেটি তার হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিল—
“আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসারে
পরাণসখা বন্ধু হে আমার।
আকাশ কাঁদে হতাশ-সম,
নাই যে ঘুম নয়নে মম-
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম,
চাই যে বারে বার।”
কবিগুরু সেই গভীর রাত্রিতে সংজ্ঞাহীন হয়ে, এক মাতাল কবির মতো গানটি গেয়ে চললেন। তার গলায় যেন ঝড়ের তাণ্ডব মিশে গিয়েছিল। প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল একান্ত ব্যথা ও ভালোবাসার গভীর আকুতি। কিন্তু মৃণালিনী দেবী গান শেষ হওয়ার আগেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি এবার ঘুমাবো। এবার এই ঝড়ের রাতে আমায় গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও।”
কবিগুরু যখন গান শেষ করে তাকে ডাকলেন, তখন মৃণালিনী দেবী আর সাড়া দেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন এক চিরনিদ্রায়। প্রথমে ডাকলেন, “ছোটোবউ।” তারপর আবার ডাকলেন। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। অবশেষে কবি তাকে সেই অন্তরঙ্গ নামে ডেকে উঠলেন, যে নামটি শুধুমাত্র তাদের সম্পর্কের একান্ত মুহূর্তে ব্যবহৃত হতো—“ছুটি।”
কিন্তু ততক্ষণে ছুটি চিরদিনের জন্য ছুটি নিয়ে চলে গেছেন। আর সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ শুধুই স্তব্ধ, একা। ঝড়ের রাতে তার গানই যেন হয়ে উঠেছিল বিদায়ের সুর। মৃণালিনী দেবী তার হৃদয়ের গভীরে চিরদিনের জন্য থেকে গেলেন—এক কবির প্রেমিকার মতো নয়, বরং এক মানুষের চিরসঙ্গী হয়ে।
এ ঘটনা শুধু তাদের ভালোবাসার এক হৃদয়বিদারক অধ্যায় নয়; এটি মানবজীবনের গভীরতম সত্যের প্রতীক। মৃণালিনী দেবী মৃত্যুর মুহূর্তেও রবীন্দ্রনাথের কাছে নিজের মানুষটি খুঁজে পেয়েছিলেন, এবং তার বিদায়ের মুহূর্তেও সেই প্রেম এক অনন্ত অনুভব হয়ে থেকে গেছে।-অনলাইন থেকে।