ফুল মরে যায় মধুবালা মরেনা। তার মত সুন্দরীরা এই দিনেই নবজন্ম নেন পুরুষদের মনে। আসুন, কোটি পুরুষের হৃদয়ে হিল্লোল তোলা সেই মধুবালাকে নিয়েই উপভোগ করি আজকের বাসন্তী রাত।
অভিনেতা অভিনেত্রিরা অভিনয় ও রূপের জাদুতে বিমোহিত করে রাখেন আমাদের, ভাসিয়ে নিয়ে যান ফ্যান্টাসির জগতে। আবার কখনও কখনও তাদের বিষাদময় জীবনের গল্প ছাড়িয়ে যায় ট্র্যাজিক সিনেমার কাহিনীকেও। এমনই এক জীবনের গল্প মধুবালার।
জন্ম ও পারিবারিক বিপর্যয়
মধুবালার জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লির এক দরিদ্র পরিবারে।
পারিবারিক নাম মমতাজ জাহান দেহলভী। বাবা আতাউল্লা খান। তিনি পেশোয়ারের তামাক কোম্পানিতে চাকরি হারিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমান মুম্বাইয়ে।
পাঁচ ছয় বছর বয়সেই মধুবালার পাঁচ ভাইবোন মারা যায়। ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাই ডকে বিস্ফোরণের ঘটনায় হারিয়ে যায় তাদের ছোট্ট ঘরটিও। এমন দুর্দশায় একমাত্র আশার আলো ছিলেন মমতাজ জাহান।
যেভাবে পর্দায় শুরু
মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের ডাক পান বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। অভিনয় দেখে তার মধ্যে জাত অভিনেত্রির ছাপ খুঁজে পান নির্মাতারা। অভিনয় জীবনে প্রবেশের কিছুদিন পর অভিনেত্রি দেবিকা রানী চৌধুরী অপরূপ রূপ ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তার নাম দেন মধুবালা।
চতুর্দশীর জ্বলে ওঠা
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ১৯৪৭ সালে ‘নীল কমল’ ছবির প্রধান অভিনেত্রির চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। রাজকাপুরের বিপরীতে অভিনয় করা এ ছবিটিই সর্বশেষ যেখানে তিনি ‘মমতাজ’ নামে পর্দায় হাজির হয়েছিলেন।
এরপর বড় পর্দায় ‘মধুবালা’র আগমনের গল্প শুধু এগিয়ে চলার। ১৯৪৯ সালের ‘মহল’ সিনেমার মাধ্যমে রাতারাতিই তিনি মহাতারকা বনে যান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে এ ছবির বিপুল সাফল্যে তার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
একে একে মুক্তি পায় দুলারি, বেকসুর, তারানা, বাদল সহ অন্যান্য ছবি।
তার তারকাখ্যাতি ভারত পেরিয়ে সাড়া ফেলে হলিউডেও। ১৯৫২ সালের আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘থিয়েটার আর্টস’ এ তাকে নিয়ে নিবন্ধ ছাপা হয়।
আমেরিকান পরিচালক ফ্রাঙ্ক ক্যাপরা তাকে অভিনয়ও করাতে চেয়েছিলেন হলিউডে। কিন্তু বাবা রাজি না হওয়ায় সে আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনেও জোয়ার
এসময় ক্যারিয়ারের পাশাপাশি জোয়ার আসে মধুবালার ব্যক্তিগত জীবনেও। ‘তারানা’ ছবিতে অভিনয় করেন দিলীপ কুমারের বিপরীতে। এ ছবির সেটেই তারা প্রেমে পড়েন।
একদিন মধুবালা তার হেয়ার ড্রেসারকে একটি লাল গোলাপ ও উর্দুতে লেখা চিরকুটসহ দিলীপ কুমারের কাছে পাঠান এবং তাকে ভালোবাসলে ফুলটি গ্রহণ করতে বলেন।
দিলীপ কুমার মুগ্ধ হয়ে ফুলটি গ্রহণ করেন। অনিন্দ্য সুন্দরী মধুবালার প্রেমপ্রার্থীর সংখ্যা কম ছিল না। আর তিনি এটি বেশ উপভোগও করতেন। কিন্তু সত্যিকারভাবে ভালোবেসেছিলেন দিলীপ কুমারকেই। দিলীপ কুমারও ভালোবেসেছিলেন মধুবালাকে।
তারা একসঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধারও পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান মধুবালার বাবা। যদিও তিনি প্রথমে বিয়েতে রাজি ছিলেন। কিন্তু পুরো বিষয়টি দেখছিলেন ‘একটি বিজনেস ডিল’ হিসেবে।
পিতা আতাউল্লা খান ততদিনে একটি প্রোডাকশন হাউজের মালিক। তার পরিকল্পনা ছিল দিলীপ কুমার ও মধুবালার বিয়ের পর তারা শুধু তার প্রোডাকশনের ছবিতেই অভিনয় করবেন। কিন্তু তার এ ধরনের অর্থলোভী আচরণ দিলীপ কুমারের পছন্দ হয়নি। সরাসরি জানিয়ে দেন সিনেমা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব পদ্ধতির বাইরে যাবেন না।
আতাউল্লা খান ক্ষুব্ধ হয়ে মধুবালার সঙ্গে দিলীপ কুমারের সম্পর্কের বিরোধিতা করতে শুরু করেন। পিতৃভক্ত মধুবালা পড়েন বিপাকে। একদিকে তার ভালোবাসা অন্যদিকে পরিবার।
বড় একটি অঘটন
সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটে যায় ‘নয়া দৌড়’ সিনেমা নিয়ে। দিলীপ কুমারের বিপরীতে এ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন মধুবালা। অগ্রিম টাকাও নেন তার বাবা। পনেরো দিন শুটিংয়ের পর সিদ্ধান্ত হয় পুরো ইউনিট ভূপাল যাবে। কিন্তু বেঁকে বসেন আতাউল্লাহ খান। তিনি মধুবালাকে ভূপাল যাওয়ার অনুমতি দেননি।
বিপাকে পড়েন প্রযোজক ও পরিচালক বি আর শর্মা। শেষে মধুবালার পরিবর্তে বৈজয়ন্তীমালাকে অভিনয় করান তিনি।
মধুবালার বাবার কাছে অগ্রিম টাকা ফেরত চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এ মামলার সাক্ষ্য দেন দিলীপ কুমার। বিষয়টি পিতৃভক্ত মধুবালাকে ভীষণ আঘাত করে।
পরে তিনি চেয়েছিলেন তার বাবার কাছে দিলীপ কুমার দুঃখ প্রকাশ করে যেন ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু দিলীপ কুমার তা করেননি।
দুটি শর্তে সম্পর্কচ্ছেদ
দিলীপ কুমার মধুবালাকে বিয়ের জন্য দুটি শর্ত দিয়েছিলেন।
এক - অর্থলোভী ও দাম্ভিক বাবার পরিবার ছাড়তে হবে।
দুই - স্টুডিওর আবদ্ধ পরিবেশে মধুবালা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তাই তাকে অভিনয়ও ছাড়তে বলেন তিনি।
মধুবালা অভিনয় ছাড়তে রাজি হলেও পরিবার ছাড়ার কথা মেনে নিতে পারেননি। গভীর অভিমান বুকে চেপে তিনি দিলীপ কুমারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছিলেন।
বলা হয়ে থাকে শুধু প্রেমিকের ওপর প্রতিশোধ নিতেই তিনি বিয়ে করেছিলেন কন্ঠশিল্পী কিশোর কুমারকে। তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। কিশোর কুমারও বুঝতে পারতেন, মধুবালা দিলীপ কুমারকেই ভালোবাসেন।
অসুস্থতা গোপন যে কারণে
‘মুঘল-ই-আজম’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে। এরপর মাত্র পাঁচটি ছবিতে অভিনয় করতে পেরেছিলেন মধুবালা। কারণ ততদিনে তার শারীরিক অসুস্থতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ছোটবেলা থেকেই হৃৎপিণ্ডের অসুখে ভুগছিলেন। তার হৃৎপিণ্ডে একটি ছিদ্র ছিল। শোনা যায় মধুবালা এ অসুখ সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু পাছে কাজের সুযোগ না পান, এ ভয়ে তার বাবা এটি প্রকাশ করতে বারণ করেন।
ধীরে ধীরে মৃত্যুর দুয়ারে
অসুখের ফলে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দুঃসহ যন্ত্রণায় ৯ বছর পার করে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে।
স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে চলে যান কোটি মানুষের স্বপ্নের রানী। এক বুক অভিমান আর ভালোবাসার জন্য বুভুক্ষু হৃদয় নিয়ে চলে যান রূপালি পর্দার ভালোবাসার প্রতিমা মধুবালা।
তথ্যসূত্র: 'Madhubala's timeless beauty' 'Business Line'
23rd February 2009
অনুলিখনঃ -- মেসবা খান