বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা

  • পা র মি তা চ্যা টা র্জি
  • ২০২৩-০৭-২৩ ০৫:৩০:৩০
image

আকাশে স্তূপ স্তূপ  মেঘ জমেছে। ছাদের আলসে ধরে অভিমনী মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে  অনুমিতা। বৃষ্টি ঝিরঝির   করে পড়তে  আরম্ভ  করেছে। অনুমিতা গুণগুণ করে গান আরম্ভ করলো, ' কবে নব ঘন বরিষণে গোপনে গোপনে এলি কেযা---- ছায়া''। 
হঠাৎ ভরাট পুরুষ কণ্ঠে গেয়ে উঠলো, " পূরবে নীরব ইশারাতে  একদা নিদ্রাহীন রাতে "। কণ্ঠস্বর  শুনেই অনুমিতার মেঘের  মতন মুখটা নির্মল হাসিতে ভরে উঠলো,সে ছুটে এলো গায়কের কাছে বুকের ওপর কিল মেরে বললো, "  কবে একটু কি বলেছিলাম তারজন্য  এতো  শাস্তি? " কতদিন পরে এলে বল তো প্রত্যুষ দা "?  কতবার ভুল স্বীকার করে মেসেজ পাঠালাম   তাও  কোন উত্তর নেই, হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে এইটুকু কোনমতে বলে অনুমিতা ঝরঝর করে কেঁদে  ফেললো। 
প্রত্যুষ অনুর থুতনি টা তুলে ধরে বললো,  এখন এতো কান্না কেনো? সেদিন তো ডাঁট দেখিয়ে খুব বললে, যাও আর আসতে হবেনা, 
আরে সে রাগের মাথায় অনেকে অনেক কিছু বলে সব অত ধরে না কি? 
ধরতে নেই  না, কথাটা নিজের বেলায় মনে থাকে যেন
হ্যাঁ মনে থাকবে:_
তাহলে মনে করে বল তো তুমি কি বলেছিলে? 
আমার যতদূর মনে পড়ছে আমি বলেছিলাম, " এই তুমি রোজ এসো নাতো, আমার তো পরীক্ষা , আর কদিন পরে,বাপি আমাকে বলছিল সামনে পরীক্ষা  পড়াশোনায় তো খুব অমনোযোগী দেখছি। 
তোমরা ছেলেরা যে মেয়েদের অসহায় অবস্থা টা কবে বুঝবে? 
আর তোমরা মেয়েরা যে ছেলেদের অসহায় অবস্থা টা কবে বুঝবে?৷৷৷  
আচ্ছা চল অনেক ঝগড়া হয়েছে এবার একটু শ্রাবণের গান গাই, আর তোমার শ্রাবণের কবিতা শুনি। 
আমার শ্রাবণের কবিতাগুলো বৃষ্টি তে সব ভিজে গেছে অনু,
কবিতাগুলো সব ঘুমিয়ে আছে আমার হৃদয়ের গভীর অন্তরে
দূর পাগল কবিতা তো তোমার বুকে, তোমার মনের আধারে আছে। হয়তো কিছুদিনের জন্য ঘুমিয়ে  আছে আবার এক নতুন ভোরের আলোর আদরের ছোঁয়ায় তারা আবার জেগে উঠবে দেখ :--
প্রত্যুষের মনে হতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসার সময় অনুর বাবার কড়া ভাষায় অপমানজনক কথা গুলো 
আজ প্রত্যুষ ওপরে উঠে আসার সময় অনুর বাবা হঠাৎ প্রত্যুষ কে ডেকে বললেন, 
প্রত্যুষ শোন তোমার সাথে আমার একটা কথা ছিল, 
হ্যাঁ কাকাবাবু  বলুন, মনের মধ্যে তখন বোধহয় সাময়িক বসন্তের বাতাস বয়ে গেলো।।
তারপর আবার সেই গম্ভীর গলা ভেসে এলো :--
হ্যাঁ যা বলছিলাম তুমি অনুর সাথে  মেশা বন্ধ  করে দাও একেবারে। বহুকষ্টে আমি আর অনুর মা ওকে কর্পোরেটে কাজ করা একজন ব্রিলিয়ান্ট ছেলের সাথে অনুর বিয়ের ঠিক করেছি, তোমার সাথে মিশতে আরম্ভ করলে
বেঁকে বসতে পারে :--
এবার ভরাট গম্ভীর গলায় প্রত্যুষ ও বললো -
দেখুন মেশোমশাই  আমি আজ এসেছিলাম ও অনেক বার ফোন করেছিল বলে, নইলে আসতাম না।
 আমিও একজন রিসার্চ স্কলার, তারপর হাত জোর করে নমস্কার করে বলল, আচ্ছা আমি আসছি। 
তাই যে মন নিয়ে অনুর কাছে এসেছিল তা যেনো একটু ধাক্কা খেয়ে গেলো।
এরপর তিন মাস পর। প্রত্যুষ মন প্রাণ দিয়ে রিসার্চের কাজ করছে, কোনদিকে না তাকিয়ে।
এরমধ্যে ফোনাটা বেজে উঠলো, প্রত্যুষ নাম না দেখে ফোনটা কেটে দিল।
আবার ফোন বেজে উঠলো, 
প্রত্যুষ ফোন কেটে দিল। 
পরের বার ফোন করতে ফোনটা ধরে ধমকের সুরে বলে উঠলো, 
কি ব্যাপার,  এতো রাতে বিরক্ত করছো কেনো?  
কেনো এরকম করছো বল তো আমার সাথে? 
তোমার তো বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে, তারপরও ফোন করে এতো বিরক্ত?  আমারও একটা আত্মসম্মান আছে ভবিষ্যতে আর কোনদিন আমাকে ফোন করবেনা,
তোমার বাবা আমাকে সেদিন যেভাবে অপমান করলেন তারপরও তুমি কি করে আমাকে ফোন করার কথা ভাবলে? 
বাবা তোমাকে অপমান করেছেন তা তোমার মুখে এইমাত্র শুনলাম। আমি তোমাকে ভালোবাসি এখনও তাই তোমাকে নির্লজ্জের মতন ফোন করি, সেটা তুমি বুঝতেই  পারলেনা, আর নিষ্ঠুরভাবে আমাকে অপমান করে গেলে। 
প্রত্যুষ অবাক হয়ে বললো, তুমি জানতে না? তোমার বিয়ের  কথা? 
না আমি কিছু  জানতাম না। বাবা মা দুজনে মিলে অত্যন্ত জোর করে বলতে পারো প্রায় ব্ল্যাকমেইল করে রাজি করিয়েছেন। 
সরি অনু সরি, আমিই  বা কি করে বুঝবো বল যে তোমাকে প্রেসার দিয়ে রাজি করানো হয়েছে? 
মেয়েরা যে কত অসহায় তা তোমরা কোনদিন বুঝবেনা,
সত্যি  আমরা বুঝিনা, আমার তোমার সাথে ভালো করে কথা বলে বুঝিয়ে বলা উচিৎ  ছিল, 
এখন আমাদের কি করা উচিৎ প্রত্যুষ দা?
এখন তুমি বিয়ে করে নাও বাবা মায়ের কথামত।ওরা যখন কিছুতেই  রাজি নন তখন এ ছাড়া তো উপায় নেই। 
তোমাকে আর একটা কথা বলি?  রাগ কর না। 
এখন তুমি যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলে তা আবেগের, সত্যি কথা বল তো?  তুমি যে স্ট্যাটাসে বড়ো  হয়েছ তাতে আমাদের  মতন একান্নবর্তী পরিবারে একেবারেই মানাতে পারতে না, প্রথম অসুবিধা হবে টয়লেটের, অতগুলো লোকের জন্য মাত্র তিনটে টয়লেট, তুমি একা একটা টয়লেট ব্যবহার কর তাছাড়া আমাদের বাড়ি দেখতে বড়ো হলেও তা কাকা, জ্যাঠা মিলে অনেকের পুরানো বাড়ি, তোমাদের মতন ঝাঁ চকচকে নয়। সবদিক টা ভেবে দেখতে হবে যে, বাস্তবের মাটিতে এসে ভালোবাসা দুদিনেই জানলা দিয়ে পালিয়ে যায়। আর যে আমাদের আলাদা থাকার কথা তুমি বলেছিলে তা কোনমতে সম্ভব নয়, আমার পক্ষে বাড়ি ছেড়ে অনত্র ফ্ল্যাট নিয়ে থাকা সম্ভব নয় দ্বিতীয়তঃ তোমার বাবার কর্পোরেট জগতের বাইরে যে পড়াশোনা বা রিসার্চের একটা জগত আছে তার কাছে তা কোন মূল্য নেই। কাজেই যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছো তাকে ভালোবেসো আর আমাকে ভুলে যেতে চেষ্টা কর,
আর আমাদের সেই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা গুলো? 
সেও থাকবে হৃদয়ের কোণে কোন এক গোপন কোণে অযত্নে অবহেলায়,  আবার কোন এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় হৃদয়ের গোপন কোণে এসে ঘা  দিয়ে  যাবে বলবে, ' দরজা খোল আমি এসেছি, একবারের জন্য আমায় কাছে ডেকে নাও,অনু বললো আমি চিরকাল থাকবো তোমাদের মনের কোণে একটি ভালোবাসার পাখি হয়ে ভুলে যেওনা কিন্ত আমাকে। 
প্রত্যুষ  রাখি তাহলে, বলেই ফোনটা কেটে দিল। তার পুরুষ চোখ ও আজ  জলে ভিজে গেল। 
অনুও আপন মনে বসে আছে, দু চোখ দিয়ে জলের ধারা আপন মনে গান গেয়ে যাচ্ছে ' আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে'।
মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,  মন খারাপ করে না মা , দেখবি আসতে আসতে সব ঠিক যাবে,
হ্যাঁ  সে তো যাবে শুধু  মরে যাবে আমাদের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, আর এক শ্রাবণের প্রত্যুষদার শ্রাবণের  কবিতাগুলো।। 
অনু  নিজের মনে বলতে লাগলো এই ভাবেই মরে যায় কত মেয়ের, স্বপ্নের ভালোবাসা। পড়ে থাকে শুধু কিছু স্মৃতি। প্রত্যুষের কবিতাগুলো কি সত্যি হারিয়ে গেলো? যা একজনের  মনের গহীনে থাকার কথা ।হঠাৎ কখনও মনের জানলায় কে যেনো বলে ওঠে, ' প্রত্যুষ দা আমাদের শ্রাবণের কবিতাগুলো তোমার বুকের মাঝে আছে তো?  রেখে দিও যত্ন করে। প্রত্যুষ বিয়ে আর করেনি। একজনের করুণ মুখটা মনের মধ্যে নিয়ে কাটিয়ে দিলো চারটে বছর! 
এত ভালোবাসা কি সত্যি হারিয়ে যায়? না না। ভগবান আছে তো? তা না হলে এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় বইমেলায় তার এতদিনের যত্ন করে রাখা ভালোবাসা ভীড়ের মধ্যে থেকে তার গলা ভেসে আসবে কেনো? 
একটা বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় বইমেলায় একটি স্টলে প্রত্যুষ আপনমনে  বই দেখছিল, কানে ভেসে এলো চির পরিচিত সেই উচ্ছল কণ্ঠস্বর, " প্রত্যুষ দা------ তুমি?  আমি ভাবতেই পারছিনা এতকাল পরে সত্যি তোমার সত্যি কোনদিন দেখা পাবো? 
চমকে উঠলো প্রত্যুষ সামনে সেই চির পরিচিত মুখটি দেখে, যর অপেক্ষায় আজও সে মনে মনে আছে। আরে ----! আমিও কি ভেবেছি নাকি। বাবা মার কাছে ফিরে আসার পর আমি আবার পড়াশোনায় মন দিলাম, বি- এড পাশ করে একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকরি নিলাম। বেশ ভালো আছি গো এখন একলা একলা। 
একলা কেনো? 
সব কেনোর কি উত্তর হয় আর তা সবসময় যায় না। তবু তোমায় বলছি--
বিয়ে আমার টেকেনি, , আসলে আমাদের মতনই ব্যাপার,ভালোবেসেছে একজনকে বিয়ে দিয়েছে আর একজনের সাথে  জোর করে। আমরা দুজনে দুজনকে সব বললাম, তাতে বললো, এভাবে তো কোন সংসার হয়না, ভালোবাসবো একজনকে বিয়ে করবো আর একজনকে। তারপর গলাটা একটু নামিয়ে অনু বললো,  আমার শ্রাবণের কবিতাগুলো কি অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছো। 
না রে পাগলী তোর শ্রাবণের কবিতা সব আমার বুকেই আছে। রেখে দিয়েছি যত্ন করে। অনুর হাতে একটা বই দিয়ে বললো, এই বইমেলায় বেরিয়েছে, অনু বইটা হাতে নিয়ে বইয়ের গন্ধ শুকলো তারপর বইটা হাতে নিয়ে দেখলো, তাতে লেখা আছে, " এক শ্রাবণের কবিতা ", তার পরের পাতা উল্টে দেখলো উতস্বর্গ করা হয়েছে অনুমিতার নামে, লেখা আছে শুধু 
' অনু শুধু তোমার জন্য '।
তারপর প্রত্যুষ  অনুর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, এসো এবার, আমাদের ভালোবাসা নোঙর পেয়েছে।