শুক্রবার, জুলাই ১৯, ২০২৪

অসংখ্য কালজয়ী জনপ্রিয় গানের কিংবদন্তী কন্ঠশিল্পী এ্যান্ড্রু কিশোর

  • এ কে আজাদ
  • ২০২৪-০৭-০৬ ১৫:৫০:১১
অসংখ্য কালজয়ী জনপ্রিয় গানের কিংবদন্তী কন্ঠশিল্পী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কন্ঠরাজ এ্যান্ড্রু কিশোর। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের সফল সমৃদ্ধিতে যাদের অবদান অনিস্বীকার্য তাদের মধ্যে সবার উপরের দিকে থাকবে বাংলাদেশের সংগীতের মহাতারকা- এ্যান্ড্রু কিশোরের নাম। বাংলা গানের অসম্ভব জনপ্রিয় এই মহান কন্ঠশিল্পীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০২০ সালের ৬ জুলাই, ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে, মৃত্যুবরণ করেন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। গুণি এই সঙ্গীতশিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। এ্যান্ড্রু কিশোর (এ্যান্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ) ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর, রাজশাহী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ক্ষীতিশ চন্দ্র বাড়ৈ, মা মিনু বাড়ৈ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় এম, কম, পাস করেন তিনি। ১৯৬২ সালে, ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর অধীনে সঙ্গীতে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। সত্তরদশকের শুরু থেকেই তিনি নজরুলসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক, লোক ও দেশাত্মবোধক গানের কন্ঠশিল্পী হিসেবে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হন । চমৎকার কন্ঠগুণে, সেই সময়েই তিনি স্থানীয়দের কাছে বেশ পছন্দের শিল্পী হয়ে ওঠেন। তাঁর সুরেলা কন্ঠ শুনে, ঢাকা বেতারের প্রযোজক এ এইচ এম রফিক তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরবর্তিতে সুরকার আলম খানের সাথে পরিচয় হয় এ্যান্ড্রু কিশোরের এবং তাঁর কন্ঠে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিয়ে গান করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। এ্যান্ড্রু কিশোরের চলচ্চিত্রে প্রথম গান গাওয়া হয় ১৯৭৭ সালে, আলম খান-এর সুরে 'মেলট্রেন' চলচ্চিত্রে, এছবিটি মুক্তিপায়নি। কন্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর মুক্তিপাওয়া প্রথম ছবি, বাদল রহমান পরিচালিত 'এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী' মুক্তিপায় ১৯৮০ সালে। এ্যান্ড্রু কিশোর আরো যেসব ছবিতে কন্ঠ দিয়েছেন তারমধ্যে- প্রতিজ্ঞা, বড় ভাল লোক ছিল, নাজমা, নাতবৌ, জনতা এক্সপ্রেস, মিন্টু আমার নাম, কেউ কারো নয়, প্রাণসজনী, বাসর ঘর, যাদুনগর, শরীফ বদমাস, প্রেমনগর, অভিযান, নান্টু ঘটক, মেঘ বিজলি বাদল, নাগ পূর্ণিমা, জনি, রাজিয়া সুলতানা, পেনশন, নতুন পৃথিবী, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, মিস্ লঙ্কা, ইনসাফ, বিরোধ, মায়ের দাবি, অপেক্ষা, আঁখি মিলন, মায়ের দোয়া, নয়নের আলো, প্রিন্সেস টিনা খান, মা ও ছেলে, লালু মাস্তান, দায়ী কে?, সহযাত্রী, স্বামী-স্ত্রী, হারানো সুর, দুই জীবন, ভাইবন্ধু, যোগাযোগ, আগমন, লড়াকু, মানসম্মান, জনি, সততা, সারেন্ডার, লাখে একটা, গরিবের বউ, ভেজাচোখ, নীতিবান, অশান্তি, লালমেম সাহেব, মর্যাদা, বীর পুরুষ, বেদের মেয়ে জোসনা, ব্যথার দান, সৎভাই, পদ্মা মেঘনা যমুনা, ক্ষতিপূরণ, ভাইজান, অবুঝ হৃদয়, ঝিনুক মালা, আত্মবিশ্বাস, রাঙ্গাভাবী, সত্য মিথ্যা, বজ্রমুষ্ঠি, দোলনা, মরণের পরে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, পিতা মাতা সন্তান, অচেনা, সান্ত্বনা, ত্যাগ, বিরোধ, ভাংচুর, অবুঝ দুটি মন, আত্ম অহংকার, দাঙ্গা, লজ্জা, শঙ্খনীল কারাগার, অন্ধ বিশ্বাস, অবুঝ সন্তান, অন্তরে অন্তরে, রঙ্গীন সুজন সখি, কাজের মেয়ে, তিনকন্যা, ঘৃণা, কমান্ডার, প্রেমযুদ্ধ, ডন, বাবার আদেশ, দেনমোহর, কন্যাদান, আঞ্জুমান, মহামিলন, স্বপ্নের ঠিকানা, আশা ভালোবাসা, এই ঘর এই সংসার, মায়ের অধিকার, প্রিয়জন, সন্ধি, স্বাক্ষর, তোমাকে চাই, জীবন সংসার, কবুল, সন্ত্রাস, কাশেম মালার প্রেম, লক্ষ্মীর সংসার, উত্থান পতন, বাংলার বধূ, প্রেমগীত, জন্মদাতা, মহৎ, কালিয়া, আনন্দ অশ্রু, গর্জন, বিশ্বপ্রেমিক, খলনায়ক, নির্মম, কুলি, টাইগার, যোদ্ধা, বিয়ের ফুল, নারীর মন, প্রেমের সমাধী, সুখের ঘরে দুখের আগুন, সবার অজান্তে, পাগলা ঘণ্টা, প্রেমের তাজমহল, অনন্ত ভালোবাসা, ফুল নেবো না অশ্রু নেবো, বিদ্রোহ চারিদিকে, সুন্দরী বধূ, প্রাণের মানুষ, সাহসী মানুষ চাই, দুই নয়নের আলো, ভালোবাসি তোমাকে, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, হৃদয়ের কথা, আজ গায়ে হলুদ, সাজঘর, কি যাদু করিলা, হাজার বছর ধরে, ডাক্তার বাড়ি, কপাল, এক কাপ চা, লালচর, ইত্যাদি । এ্যান্ড্রু কিশোরের গাওয়া কালজয়ী জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- কারে বলে ভালবাসা করে বলে প্রেম..., ভালবেসে গেলাম শুধু ভালবাসা পেলাম না..., জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প..., হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস..., ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে..., আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি...., আমার বুকের মধ্যে খানে...., আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান...., ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা...., সবাই তো ভালোবাসা চায় ..., পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার ছুঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি..., আমি একদিন তোমায় না দেখিলে...., তুমি আজ কথা দিয়েছো...., বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে...., তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন...., পৃথিবীতো দু'দিনেরি বাসা..., ভালবাসিয়া গেলাম ফাসিয়া..., তুমি যেখানে আমি সেখানে, সেকি জানো না..., চাঁদের সাথে আমি দেবোনা তোমার তুলনা..., আমি চিরকাল প্রেমেরই কাঙ্গাল...,পড়ে না চোখের পলক.., আমার গরুর গাড়ীতে বউ সাজিয়ে.., আজ রাত সারা রাত জেগে থাকবো.., বুকে আছে মন, মনে আছে আশা..., কি যাদু করিলা প্রীতি শিখাইলা..., ওগো বিদেশীনি তোমার চেরিফুল দাও..., তোমাকে চাই শুধু তোমাকে চাই..., কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো বুক চিরিয়া..., গান আমি গেয়ে যাব এই আসরে..., রুমাল দিলে ঝগড়া হয়...,পাথরে ফুল ফোটাব..., আমার হৃদয় একটা আয়না..., কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালবাসা চাওয়াটাই ভুল..., আজ বড় সুখে দুটি চোখে জল এসে যায়..., তোমায় দেখলে মনে হয়..., তুমি ডুব দিওনা জলে কন্যা...., তুমি মোর জীবনের ভাবনা.., সবার জীবনে প্রেম আসে..., ভালো আছি ভালো থেকো..., প্রভৃতি। এ্যান্ড্রু কিশোর তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তারমধ্যে আটবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। যেসব ছবিতে শ্রেষ্ঠ কন্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন- বড় ভালো লোক ছিল(১৯৮২), সারেন্ডার (১৯৮৭), ক্ষতিপূরণ (১৯৮৯), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), কবুল (১৯৯৬), আজ গায়ে হলুদ (২০০০), সাজঘর (২০০৭), কি যাদু করিলা (২০০৮)। পাঁচবার পেয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার। প্রিন্সেস টিনা খান (১৯৮৪), স্বামী-স্ত্রী (১৯৮৭), প্রেমের তাজমহল (২০০১), মনে প্রাণে আছো তুমি (২০০৮), গোলাপী এখন বিলেতে (২০১০) ছবিতে শ্রেষ্ঠ কন্ঠশিল্পী হিসেবে বাচসাস পুরস্কার পান। এছাড়া মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ১৯৯৮-১৯৯৯, উত্তম কুমার পুরস্কার, অন্যদিন-ইমপ্রেস পুরস্কার'সহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় সম্মানিত হয়েছেন তিনি। এ্যান্ড্রু কিশোর ব্যক্তিজীবনে ১৯৮৮ সালে, লিপিকা এ্যান্ড্রু ইতির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই সন্তান- মিনিম এ্যান্ড্রু সংজ্ঞা ও জুনিয়র এ্যান্ড্রু সপ্তক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। জনপ্রিয়তার শীর্ষেও ছিলেন তিনি। খেতাব পেয়েছেন 'প্লেব্যাক কিং' হিসেবে। তাঁর গাওয়া গানে, আনোয়ার হোসেন-নায়ক রাজ্জাক থেকে শুরু করে নায়ক রিয়াজ-ফেরদৌস এবং বর্তমানের নায়ক শাকিব খান পর্যন্ত ঠোট মিলিয়েছেন/অভিনয় করেছেন। এমনকি কৌতুক অভিনেতা টেলি সামাদ, মতি, দিলদার, আফজাল শরীফ, এদের লিপেও আছে তাঁর গান। কন্ঠের নিপুণ কারুকার্যময় মাধূর্যে, সবার লিপেই মানিয়ে যেত তাঁর কন্ঠ । বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক ইতিহাসে, এ এক আশ্চার্য রকমের সফলতা এ্যান্ড্রু কিশোরের। চলচ্চিত্রের বাইরেও বেতারে-টেলিভিশনে আধুনিক, দেশাত্মবোধক, ফোক সবধরনের গানেই তাঁর পারদর্শীয়তা-জনপ্রিয়তা বিস্তৃত ছিল ইর্ষ্যণীয় পর্যায়ে। অসংখ্য শ্রুতিমধুর ভালো গান গেয়ে বর্নীল করেছেন নিজের জীবন। কণ্ঠযাদুতে বিমোহিত করেছেন-রাঙিয়েছেন কোটি কোটি মানুষের মন। বাংলা গানের অসম্ভব জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী, শ্রুতিমধুর কন্ঠের যাদুকর, বাংলা গানের উজ্জ্বল নক্ষত্র এ্যান্ড্রু কিশোর, কোটি কোটি দর্শক-শ্রতার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেচেঁ থাকবেন অনন্তকাল।

এ জাতীয় আরো খবর