বিসিএসের ভাইভা দিতে গিয়ে লক্ষ করলাম এক ভদ্রলোক আমাকে বেশ কিছুক্ষণ যাবত অনুসরণ করছেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না কে?
হয়তো পরিচিত কেউ হবে। বেশ দূরে থাকায় চেহারা স্পষ্ট না। কিছুক্ষণ সেদিকে চোখ গেলেও আমার মেয়ে নায়রার কান্নায় আমার সম্বিত ফিরে আসলো।
আমার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে বিয়ে হয়। বিয়ের পরপরই বাচ্চা পেটে আসে। অনার্স পরীক্ষাটা বাবু পেটে নিয়েই দিয়েছিলাম।
এরপর পড়াশোনায় মন দিতে বেশ কষ্ট হয়েছিল তবে আমার স্বামী যায়েদ আমাকে পিছু হটতে দেয়নি। সাহস যুগিয়েছে প্রখর। সে সাহস আর সাপোর্ট আর আমার অক্লান্ত পরিশ্রমেই বিসিএসের ভাইবা পর্যন্ত আসা।
নায়রাকে সামলাতে সামলাতে যায়েদের দিকে তাকাতেই সে হালকা হেসে বলল,
--- এত চিন্তিত হবার কিছু নেই। অবশ্যই ভালো হবে ভাইভা। আর নিশ্চিন্ত মনে সব প্রশ্নের উত্তর দিবে। নায়রার জন্য কোনো চিন্তা করবে না আমি ওর খেয়াল রাখব।
আমি হালকা হেসে উত্তর দিলাম,
--- সেটা আমি জানি। নায়রাকে তুমি আমার থেকে ভালো সামলাতে পারো। আমি মরে গেলেও নায়রার জন্য চিন্তা নেই।
যায়েদ আমার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,
--- একদম এ কথা বলবে না। আল্লাহর কাছে বলো আমরা দুজনেই যেন নায়রার উত্তম অভিভাবক হয়ে একসাথে পাশে থাকতে পারি। নায়রাকে সুন্দর পথে পরিচালিত করতে পারি। আমাদের দুজনকেই যেন আল্লাহ একইসাথে তাঁর কাছে নিয়ে যান।
যায়েদের কথাগুলো বেশ শীতল করে মন। তিন বছর হয়েছে বিয়ের। মান অভিমানের অনেক পালা আসলেও যায়েদ কখনও আমার সাথে উচ্চ বাক্যে কথা বলেনি। বরং বুঝিয়েছে, ভুলগুলো শুধরে দিয়েছে। শাসন করলেও সেটা সুন্দর করে গুছিয়ে করেছে। আমি শুধু এ মানুষটাকে প্রতিদিন আবিষ্কার করি নতুন নতুন ছন্দ তালে। একটা মানুষ এত ভালো কী করে হয়! কী করে সে এত সাপোর্টিভ হয়! কথাগুলো ভেবে হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম,
--- আল্লাহ যেন কবুল করে নেন।
বলেই নায়রাকে যায়েদের কোলে দিলাম। যায়েদ নায়রাকে সামলাতে লাগল। আমি একটু এগিয়ে গেলাম।
সামনে যেতেই ভদ্রলোকের দিকে আমার চোখ পড়ল। বুকের ভেতরে একটা হালকা ধাক্কা লাগল আমার।
উনিই সে ভদ্রলোক যার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল তিন বছরের।
বেকার ছেলেটাকে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবেসেছিলাম। সম্পর্ক থাকাকালীন সময় আমি তার সাথে বেশি দেখা করতাম না।
বছরে দুই, তিনবার দেখা করতাম।
এর বিশেষ একটা কারণ ছিল টাকা।
আমি জানতাম আমাদের দেখা হলে টাকা খরচ হবে। রিকশায় ঘুরতে গেলেও ১০০-২০০ টাকা খরচ হবে। তাই দেখার সংখ্যাটা বছরের দুই থেকে তিনবারের থেকে বৃদ্ধি পেত না।
আর যতবার দেখা হত রিকশা ভাড়া গুলো আমার থেকেই দিতাম।
কারণ তার বাবার দেওয়া মাসে ৫ হাজার টাকা তার খাওয়া খরচেই চলে যেত। রিকশা ভাড়া আমি দিলেও দেখার সংখ্যা এত কম কেন প্রশ্ন জাগতে পারে।
এর উত্তর হলো বছরে দু তিনবার দেখা করে রিকশা ভাড়া আমি দিলে সেটা তার সম্মানে তেমন লাগবে না বা বুঝবেও না।
কিন্তু প্রায়শয় দেখা করে রিকশা ভাড়া আমি দিলে সেটা তার সম্মানে লাগতে পারে। তাই এ পন্থা অবলম্বন করেছিলাম। আর এমনিতেও সে পড়াশোনা করত সিলেটে আমি থাকতাম ঢাকায়। লং ডিসটেন্স হওয়ায় প্রায়শয় দেখা করাও সম্ভব ছিল না।
আমি তার কাছে খুব দামি কিছু চাইতাম না। একটা ছোট্ট কিটকাট দাবি করতাম। বলতাম আমার জন্য কিটক্যাট না আনলে তোমার সাথে কথা নেই। তার কাছে এ কিটক্যাট দাবি করার পেছনে কারণ ছিল সে যেন আমাকে দামি গিফট দিতে না পারায় মন খারাপ না করে, সে যেন ভাবে আমি এতেই অনেক খুশি।
কারণ তাকে মাঝে মাঝে আফসোস করতে দেখতাম তার বড়লোক বন্ধু তার প্রেমিকাকে এই সেই দেয় সে আমাকে দিতে পারে না। সরাসরি না বললেও আকার ইঙ্গিতে বুঝাত। তার এ পরিতাপ কমানোর কৌশল হিসেবে কিটকাট চাইতাম।
অপরদিকে তার মিতব্যয়ীর বাবার অনেক টাকা থাকা সত্ত্বেও বিলাসিতার জন্য টাকা তাকে দিত না। দেখা যেত কোনো দামি শার্ট তার ছিল না।
তাই মাঝে মাঝে ভার্সিটি যাওয়ার রিকশা ভাড়াটা জমিয়ে পায়ে হেঁটেই চলে যেতাম।
এতে প্রতিদিন আমার ২০ টাকা বেঁচে যেত। সে টাকা জমিয়ে যখন ১৫০০- ২০০০ হত তখন সেটা দিয়ে তার জন্য শার্ট কিনতাম। এ শার্টের টাকাটা জমাতে আমার মাস তিন থেকে চারেক সময় লেগে যেত।
মাঝে মাঝে এর চেয়ে বেশি সময়ও লাগত। তবুও তাকে একটা শার্ট কিনে দেওয়াতে ভীষণ পরিতৃপ্তি পেতাম। আনন্দ হত ভীষণ। সে আবার সে শার্টটা রেখে দিয়ে বলত বিসিএসের ভাইভা দিবে এটা পরে। সেদিন তার স্বপ্নটাকে আগলে রাখার জন্য সাহস দিয়েছিলাম।
সে সময়টা আমার জন্য পার করা ভীষণ কঠিন ছিল। বাসা থেকে বিয়ের চাপ দিত। একের পর এক বিয়ে নির্দ্বিধায় ভেঙে যেতাম। মাঝে মাঝে বাসা থেকে ভীষণ মারও খেতাম। সে কল দিলে মনের অজান্তেই কান্না চলে আসত। তবুও তাকে চাপ দিতাম না। শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে কান্না থামিয়ে কথা বলতাম। সে কিছুটা আন্দাজ করে বলত
--- তুমি কি কাঁদতেছো?
আমি মুখে হালকা হাসির ফিনিক তুলে বলতাম,
--- ধুর বোকা ঠান্ডা লেগেছে আমার।
--- ঔষধ খাও।
--- খাব পরে।
--- আচ্ছা তোমার যদি ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসে বিয়ে কি করে ফেলবে?
যতদূর জানতে পেরেছি তোমার অনেক ভালো ভালো বিয়ের প্রপোজাল আসছে। রিসেন্ট একজন আর্মি অফিসার আর ইডুকেডেট ক্যাডার আসছে। বাসা থেকে তোমাকে চাপ দিচ্ছে না?
--- বাসা থেকে চাপ দিলে আমি ম্যানেজ করে নিব। তবে তোমাকে এসব কে বলল?
--- তোমার কাজিন বললো।
--- বাদ দাও সেসব কথা।
--- ছেড়ে চলে যাবে না তো?
--- ছাড়ার জন্য হাত ধরিনি। এত অনিশ্চয়তা কিসের?
এভাবেই দিন গড়িয়ে মাস,মাস গড়িয়ে বছর পার হলো। তার বিসিএস হলো। দুই পরিবারের কথা হলো। তার পরিবার আমাদের বাসায় আসার ঠিক আগের দিন ফোন করে জানাল,
--- তাদের বিসিএস ক্যাডার ছেলের জন্য একজন যোগ্য বউ দরকার।
আমার মতো ন্যাশনালে অনার্সে পড়ে মেয়ে তাদের ছেলের বউ হওয়ার যোগ্য না। আমি তখন চুপ ছিলাম। তাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
--- তোমারও কী একই কথা?
সে হালকা গলায় বলল,
--- পরিবারের বাইরে যেতে পারব না।
আমি নিঃশব্দ কান্না করে মুখে হাসি দিয়ে বলেছিলাম,
--- শুভ কামনা রইল। একটা সময় আমাকে হারাবার অনিশ্চয়তায় থাকা মানুষটাও আজকে আমাকেই তার জীবন থেকে মুছে ফেলছে। ভালো থাকবে।
--- আমাকে ক্ষমা করে দিও।
--- ভুল করোনি ক্ষমা করবো।
আমার ভুল হয়েছিল তোমায় চিনতে।
বলেই কলটা কেটে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। তার হাত ধরে কখনও হাঁটিনি আমি। সবটা রেখে দিয়েছিলাম পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবার অপেক্ষাতেই। মনে মনে বলতে লাগলাম,
--- যে হাত আমি ধরতেই পারিনি সে হাত দূরে চলে গেলেই বা কী? কিন্তু মনের ভেতরে তো তাকে জায়গা দিয়ে দিয়েছিলাম সে জায়গা শূন্য করতে পারব তো?
সেদিন মাত্রারিক্ত কেঁদেছিলাম। পরিবারের কেউ কিছু বলেনি। কাঁদার সুযোগ করে দিয়েছিল। সেদিনের পর আর কাঁদিনি।
.
এর মধ্যে তার বিয়ে হয়। বেশ জমাকালো আয়োজনও হয়। আমি শুধু দেখে গিয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকে যোগাযোগ নেই তার সাথে।
তারপর কী করে এক বছর পার হলো জানি না। ক্ষত শুকিয়ে যন্ত্রণা কমে গেল। দেখা হলো যায়েদের সাথে। মানুষটাকে প্রথম দেখায় আমি ভালোবেসেছিলাম। পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। এরপর গুটি গুটি করে তিনটা বছর পার করে ফেললাম। তাকে পেয়ে সব ভুলে গেলাম।
আজকে প্রাক্তনকে এত কাছ থেকে দেখেও তেমন অনুভূতি কাজ করছে না কারণ সব অনুভূতি এখন যায়েদকে ঘিরে।
তবে তাকে দেখে অতীতের খারাপ সময়টা খানিকের জন্য চোখে ভেসে উঠেছিল।
তবে সে খারাপ সময় এসেছিল বলেই আজকের ভালো সময় উপভোগ করতে পারছি।
যায়েদ হয়তো বিসিএস ক্যাডার না তবে সে আমার মনের আঙিনায় ভালোবাসার সদ্য প্রস্ফুটিত হওয়া ফুল। আমি ভাইভা রুমে ঢুকলাম।
ভাইভা টা দেওয়া শেষ করে লক্ষ্য করলাম সে এখনও দাঁড়িয়ে আর যায়েদ একটু দূরে নায়রাকে যেন কী দেখাচ্ছে কান্না থামানোর জন্য। আমি তাকে উপেক্ষা করে যায়েদের দিকে যেতে নিলে সে নীচু গলায় আমাকে পিছু ডেকে বলল,
--- সেদিন তোমাকে ঠকনো উচিত হয়নি। আমি ভালো নেই। অনেক খোঁজ নিয়ে এখানে এসেছি কারণ জানতাম তুমি ভাইভা দিতে আসবে। দুই বছর হলো আমার ডিভোর্স হয়েছে। এরপর তোমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে জানতে পারি তুমি বিয়ে করে নিয়েছো। তবে তোমার কাছে ক্ষমা না চাইলে আমি হালকা হতে পারতাম না। তাই ক্ষমা চাইতে এসেছি। এ দু বছর আমি অনুতাপে কুঁড়ে কুঁড়ে মরেছি।
সেদিন বিসিএসের মোহে ডুবে গিয়েছিলাম আমি। তোমার মতো রত্নকে দূরে সরিয়ে কাঁচকে কাছে টেনে নিয়েছিলাম। আর আজ সে কাঁচের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আজ আমার ভেতরটা যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছে।
আমি কোনো জবাব দিলাম না। তার কথাকে উপেক্ষা করেই যায়েদের কাছে গেলাম। নায়রাকে কোলে নিয়ে বললাম
--- ভাইভা ভালো হয়েছে।
--- যাক আলহামদুলিল্লাহ। আচ্ছা ঐ ভদ্রলোক কে? তোমার সাথে কথা বলছিলো?
হালকা হেসে জবাব দিলাম,
--- যার জন্য তোমাকে আমি পেয়েছি। তোমার ভালোবাসায় নিজেকে সিক্ত করেছি। কিছু না পাওয়া হয় বিশেষ কিছু পাইয়ে দেওয়ার জন্য। সে ছিল সে না পাওয়া আর তুমি হলে আমার পরম যত্নে পাওয়া সে বিশেষ কিছু।
যায়েদ আমার হাতটা শক্ত করে ধরল। সে আমার অতীত জানে। আর এটাও জানে আমার মনে সে ছাড়া আর কোনো মানুষের বিচরণ নেই।
দুজনেই হালকা হাসলাম একে অপরের দিকে তাকিয়ে।
বেশ তৃপ্তি এ হাসিতে। নেই কোনো ক্লান্তি, নেই কোনো কষ্ট, নেই কোনো যন্ত্রণা। শুধু আছে পরম ভালোবাসা। আজকে সেই ন্যাশনালে পড়া মেয়েটায় বিসিএস ক্যাডার হতে যাচ্ছে। মেয়েটা জানে তার ভাইভা অনেক ভালো হয়েছে।
বিসিএসটা তার হয়ে যাবে। আর আজকে সে মেয়েটা পরম সুখী তার জীবনসঙ্গী নিয়ে। সে জানে তার এ বন্ধন সহজে ছিন্ন হবে না। কারণ তার এ বন্ধন গড়ে উঠেছিল ভালোবাসার পরম ছোঁয়ায় কোনো লেনদেনের যাতাকলে না।
সময় কখনও ছাড় দেয় না। সময়ের সাথে সবটা গ্রহণ করে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। সময়েই সময়ের প্রতিশোধ নিয়ে নেয়।