রবিবার, মার্চ ৮, ২০২৬

এদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার পথিকৃৎ : ফজলুল হক

  • এ কে আজাদ
  • ২০২৩-১০-২৬ ২৩:১২:২৯

ফজলুল হক। চলচ্চিত্র সাংবাদিক-পরিচালক-প্রযোজক।আমাদের দেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তিনি।
এদেশের প্রথম চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা 'সিনেমা'র সম্পাদক। এদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাতা । তাঁর প্রকাশিত চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকী মাসিক 'সিনেমা'কে ঘিরে সেই ৫০-এর দশকে তৈরি হয়েছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের ফোরাম, যাঁদের হাত ধরে পরবর্তিতে সুদৃঢ় হযেছে এদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত। 
এদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের সূচনালগ্নে, চলচ্চিত্রশিল্পের অগ্রযাত্রায় রেখে গেছেন অনন্য ভূমিকা।  
আমাদের দেশের চলচ্চিত্র তথা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কৃতিমান ব্যক্তিত্ব ফজলুল হক এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ । তিনি আজ থেকে ৩৩ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ২৬ অক্টোবর, ভারতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। প্রয়াত গুণীব্যক্তিত্ব ফজলুল হক-এর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। 
ফজলুল হক (আবু তাহের মোহাম্মদ ফজলুল হক) ১৯৩০ সালের ২৬ মে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে (তাঁর বাবার কর্মস্থল), জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক বাড়ি বগুড়া জেলার, গাবতলি উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের রাণীরপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবা এফ মাহমুদ একজন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার ছিলেন। মা এফ জাহান। ফজলুল হক সাহেবরা ছিলেন ৭ ভাই বোন। তাঁর ভাইয়েরা হলেন- ফজলুর রহমান, ডাঃ এ বি এম ফজলুল করিম (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ), ফজলুল বারী (মেজর অবঃ), এ কে এম ফজলুর রহিম (ব্যাংকার), ড. এ কে এম ফজলুল আলম (লেখক-গবেষক-টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপক) আর এক বোন- ফিরোজা বেগম।

No description available.
ফজলুল হক সাহেব পড়ালেখা করেছেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ও বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে। কিশোরবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি নাটক লিখতেন ও অভিনয় করতেন।
ফজলুল হক সাহেব ১৯৫০ সালে
বগুড়া থেকে বের করেছিলেন এদেশের প্রথম চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা 'সিনেমা'। প্রকাশক-সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজেই। পরবর্তী সময়ে 'সিনেমা'র প্রকাশনা ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হত, ২ এসি রায় রোড, ঢাকা থেকে। তৎকালীন সময়ের অত্যন্ত মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় ছিল 'সিনেমা' পত্রিকাটি। অনেক নামি-দামি সাংবাদিক ও লেখকরা জড়িত ছিলেন ‘সিনেমা’ পত্রিকাটির সাথে।
পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'ইনলেন্ড প্রেস' নামে বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ফজলুল হক সাহেবের এই  প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে, পরবর্তিতে বিখ্যাত হয়েছেন এমন অনেকের লিখা প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে। 
একসময় ফজলুল হক সাহেব চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সাথে জড়িত হন। ১৯৬০ সালে- রহমান, শবনম, চিত্রা সিনহা, রানী সরকার ও অন্যান্যদের নিয়ে শুরু করেন, 'আযান' নামে একটি চলচ্চিত্রের কাজ। বিভিন্ন কারণে যথাসময়ে ছবিটি মুক্তিপায়নি। পরবর্তিতে 'উত্তরণ' নামে ১৯৭৫ সালে এই ছবিটি মুক্তিপায়।
অনেক কিছুরই, প্রথম-এর সাথে জড়িত থাকতেন ফজলুল হক সাহেব। তদানিন্তন পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। 'সান অফ পাকিস্তান' নামে এই ছবিটি মুক্তিপায় ১৯৬৬ সালে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ফুটে উঠেছিলো তাঁর নির্মিত এই চলচ্চিত্রে। তাঁর নির্মাণ দক্ষতার ধারে কাছেও এখনো পর্যন্ত কোন শিশুতোষ চলচ্চিত্র যেতে পারেনি বলে- অভিমত সিনেমাপ্রেমীদের।
'সান অফ পাকিস্তান' চলচ্চিত্রটি সেই সময়ে পুরস্কৃতও হয়েছিল। এই ছবিতে পরিচালক ফজলুল হক ও তাঁর দুই সন্তান, ফরিদুর রেজা সাগর ও কেকা ফেরদৌসী অভিনয় করেছেন। শিশুনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন আজকের স্বনামধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর। 
পত্রিকা সম্পাদনা, বই প্রকাশনা বা চলচ্চিত্র পরিচালনা কোনোটাতেই তিনি থেমে থাকেন-নি। অন্যান্য ব্যবসার সাথেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। ঢাকার গুলিস্তান এলাকায় 'খাবার দাবার পিঠাঘর' নামে একটি বাঙালিয়ানা খাবার দোকান খোলেন । 'খাবার দাবার পিঠা ঘর' আজও তাঁর ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে। 
নতুন নতুন সববিষয় নিয়ে ভাবতেন তিনি, ছিলেন স্বপ্ন বোনার একজন মেধাবী মানুষ। জানা যায়- সেই সময়ে তিনি বাংলা ঘড়ির প্রবর্তন করেছিলেন। আজকের যে- ফ্লাটবাড়ির এ্যাপার্টমেন্ট পদ্ধতি, এর উদ্ভাবনিচিন্তা ফজলুল হক সাহেবের মাথায় তৎকালীন সময়েই এসেছিল। তিনি এটা নিয়ে তখন কাজও শুরু করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। 
ব্যক্তিজীবনে ফজলুল হক সাহেব ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই, প্রখ্যাত সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ৪ সন্তান। বড় ছেলে ফরিদুর রেজা সাগর, একজন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। মেয়ে কেকা ফেরদৌসী একজন রন্ধন বিশেষজ্ঞ। আরেক ছেলে ফরহাদুর রেজা প্রবাল, সে একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপক। ছোট মেয়ে ফারহানা মাহমুদ কাকলী।
ফজলুল হক সাহেব ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, মেধাবী সৃজনশীল মানুষ। যখন এদেশে কেউ চলচ্চিত্র নির্মানের কথাই ভাবেনি, তখন তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, ভেবেছিলেন চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকার কথা এবং স্বপ্ন ও ভাবনার বাস্তবায়নও করেছিলেন। এদেশে সিনেমা শিল্পের যাত্রা শুরুর আগেই সিনে সাংবাদিকতা বা চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ, রীতিমতো দুঃসাহসিক কাজই ছিল। ফজলুল হক সাহেব সেই অসাধ্য কাজটি করেছিলেন। তাই সম্মানের সাথে তাঁকে এদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বলা হয়ে থাকে।  
একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সুস্থ-সুন্দর চলচ্চিত্রশিল্প তথা সংস্কৃতিময় পৃথিবীরও স্বপ্ন দেখতেন। শিশুদের জন্যও একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি, তাইতো নির্মাণ করেছিলেন এদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র। ফজলুল হক সাহেব স্বপ্ন দেখতেন, এদেশেও গড়ে উঠবে- হলিউডের মতো বিশ্বমানের- ফিল্ম সিটি।
এই মহান মানুষটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে তাঁর পরিবার থেকে প্রবর্তন করা হয়েছে- ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার।  ফজলুল হক স্মৃতি কমিটির ব্যানারে প্রতি বছর একজন চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও একজন সেরা চলচ্চিত্র পরিচালককে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে।
তাঁর প্রকাশিত চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকী মাসিক 'সিনেমা'কে ঘিরে সেই ৫০-এর দশকে তৈরি হয়েছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের ফোরাম, যাঁদের হাত ধরে পরবর্তিতে সুদৃঢ় হযেছে এদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত্তি। আজ সেই সিনেমা নেই, নেই বিনোদন সাংবাদিকতার অগ্রপথিক ফজলুল হকও। কিন্তু তিনি যে, বিনোদন সাংবাদিকতার পথ বিনির্মাণ করে গেছেন, সেই পথে এগিয়ে চলছে আজ শত সহস্র অভিযাত্রী। 
এদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় এবং এদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের সূচনালগ্নে, চলচ্চিত্রশিল্পের অগ্রযাত্রায়, ফজলুল হকে সাহেবের অনন্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।


এ জাতীয় আরো খবর