বৃহস্পতিবার, জুন ১৩, ২০২৪

এক যে ছিলো নেতা :আরতি সাহা

  • স্বপন সেন
  • ২০২৩-০৯-২৭ ০৯:৪৫:৪৩
২৭শে অগস্ট ১৯৫৯ ... ফ্রান্সের দিক থেকে সমুদ্র নামলো এক বাঙালি তরুণী। উদ্দেশ্য চ্যানেল পার। শুরুতেই গণ্ডগোল, প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরিতে এলো পথ প্রদর্শক বোটটি, কিন্তু তা দমিয়ে রাখতে পারেনি উনিশ বছরের ঐ বঙ্গ ললনাকে। ১৪ ঘণ্টা ১০ মিনিট সাঁতার কাটার পরে গন্তব্যে পৌঁছতে তখন বাকি মাত্র ৩ মাইল। বোটম্যান ঘুরপথে নিয়ে গেলে তরুণী স্রোতের বিপরীতে পড়ে যায়। তাঁর পাশে তখন সাঁতার কাটছেন ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকের সোনাজয়ী সাঁতারু গ্রেটা অ্যান্ডারসন। স্রোতের মুখে আর এগোতে পারছেন না দেখে বোটম্যান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেন । ব্যাস স্বপ্ন শেষ। নিয়মানুয়াযী কেউ সাঁতারুকে স্পর্শ করলে সে বাতিল হয়ে যায় । নৌকায় উঠে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে তরুণী, সত্যিই যে তীরে এসে তরী ডুবলো ! সেই চার বছর বয়স থেকে কাকা বিশ্বনাথের সঙ্গে প্রতি দিন চাঁপাতলার ঘাটে স্নান করতে যেত মেয়েটা, জলের নেশা তখন থেকেই। মেয়ের উৎসাহ দেখে বাবা তাকে হাটখোলা সুইমিং ক্লাবে ভর্তি করে দিলেন। এক বছর পরে শৈলেন্দ্র মেমোরিয়াল সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১১০ গজ ফ্রি-স্টাইলে প্রথম হলো। কোচ শচীন নাগের কোলে চড়েই পুরস্কার আনতে গিয়েছিলেন ছোট্ট মেয়েটি। প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারের শুরু এখান থেকেই। এর পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত নানা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে বিদেশের মাটিতেও নাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫২তে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে সাঁতারু ডলি নাজিরের সাথে সে ছিল ভারতের সর্ব কনিষ্ঠ প্রতিনিধি। তারপরেই সব সাঁতারুর মতো স্বপ্ন দেখেছিল চ্যানেল জয়ের । কিন্ত চাইলেই তো আর হয়না । সাঁতার কেটে ততদিনে বেশ নামডাক হয়েছে কিন্ত দরকার যে অনেক টাকার । সাউথ ইস্টার্ন রেলে চাকরির সুবাদে তখন মাইনে পেতেন ১৪৪ টাকা ! দিনে পাঁচ-ছ’ঘণ্টা অনুশীলন, চাকরি, তার পর টাকার জন্য ঘুরে ঘুরে খালি হাতে ঘরে ফেরা ছিল নিত্যকার ঘটনা। অল ইন্ডিয়া স্পোর্টস কাউন্সিল-এর সদস্য পঙ্কজ গুপ্ত তাকে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য পাঠালেন। চ্যানেল পার হওয়ার কথা শুনে তিনি বলেছিলেন, —“ ইংলিশ চ্যানেল চোখে দেখেছ যে পার হবে বলছ?” পরে অবশ্য তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, — “ সকালে টাকা পৌঁছে যাবে। হাসি মুখে ফিরতে পারবে তো মা? ২৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯ ভোর ৫ টা ৫৫ মিনিটে জলে নামলো মেয়েটা কেপ গ্রিস নে থেকে। আঁকাবাঁকা পথে সাঁতরে ৪২ মাইল পথ অতিক্রম করে উঠতে হবে ইংল্যান্ডের ফকস্টোনে । এবারে তার গাইড ছিলেন ক্যাপ্টেন হার্টিনসন, বিগত বিশ বছরে এই প্রথম তিনি কোন মহিলাকে পথ দেখাচ্ছিলেন । ফকস্টোন থেকে ৫ মাইল দূরে স্যান্ডগেটে বোট থেমে গেলেও নিয়ম অনুযায়ী আরও ১০ গজ হেঁটে যেতে হয় প্রতিযোগীদের। অবশেষে ১৬ ঘণ্টা ২০ মিনিটে চ্যানেল পেরিয়ে প্রথম এশীয় মহিলা হিসাবে রেকর্ড করলন কলকাতার আরতি_সাহা। বয়স তখন মাত্র উনিশ বছর। চ্যানেল জয় করার পরেই হালিশহর বদ্যিবাড়ির মেজ ছেলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ডাক্তার অরুণ গুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ঘটকালি করেছিলেন বাংলার চিরকুমার মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দিল্লির তিনমূর্তি ভবনে তাঁদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রথম মহিলা ক্রীড়াবিদ হিসেবে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হন আরতি গুপ্ত এবং তিনিই ক্রীড়া জগতের প্রথম মহিলা যার স্মরণে ১৯৯৯ সালে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয় । ১৯৯৪ সালের ২৩শে আগস্ট এনকেফেলাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন সাগর সাঁতরে চলে যান অমৃতলোকে। বয়স হয়েছিল মাত্র চুয়ান্ন বছর । উদাসীন বাঙালি ভুলেছে প্রথম এই সাগরকন্যাকে। আজ যে তাঁর জন্মদিন...

এ জাতীয় আরো খবর