বুধবার, জুন ১০, ২০২৬

অনন্ত ইজি-বাইক

  • সামসুদ্দিন সুমি
  • ২০২৬-০৬-০৯ ১৯:৫৫:৩০

সকাল সাড়ে সাতটা। ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত আকাশটায় আজ মেঘ জমেছে, তবে গরম কমেনি। এক ফোঁটা বাতাস নেই।
মফিজ সাহেব ড্রয়িংরুমের ইজিচেয়ারে বসে আছেন। তার একহাতে সস্তা চারকোনা ফ্রেমের চশমা, অন্যহাতে গেঞ্জির কোণা। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে চশমার কাচ মুছছেন। মানুষের বয়স বাড়লে চশমা মোছার প্রতি এক ধরণের মায়া জন্মে, মফিজ সাহেবেরও জন্মেছে। তিনি প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর চশমাটা চোখের সামনে ধরে পরীক্ষা করছেন, যেন পৃথিবীর সমস্ত ধুলোবালি এই কাচেই এসে জমেছে।
তার বড় ছেলে রাশেদ ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখছে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। আজ তার একটা ইনকোর্স পরীক্ষা আছে। রাশেদের মুখভঙ্গি গম্ভীর।
পাশের সোফায় বারো বছরের নিতু পা দোলাচ্ছে আর বিরস মুখে একটা ইংরেজি খবরের কাগজের ভেতরের পাতা ওল্টাচ্ছে। সে কিছুই পড়ছে না, কেবল পাতা ওল্টানোর শব্দ করছে।
বাড়িটা নিঝুম। এই সময়ে রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ ভাজার কিংবা রুটি সেকার একটা চড়চড় শব্দ আসার কথা। আজ কোনো শব্দ নেই। বাড়িটার এই নীরবতা মফিজ সাহেবের পছন্দ হচ্ছে না। তিনি চশমাটা নাকে পরে খবরের কাগজের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, "আজকে কি চা-নাস্তার পর্ব বাদ? আমরা কি সবাই আজ থেকে মহাত্মা গান্ধীর মতো অনশন শুরু করলাম?"
মফিজ সাহেবের স্ত্রী রেহানা বেগম রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে একটা শক্ত প্লাস্টিকের পাইপ। এক সময় এই পাইপ দিয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামে পানি দেওয়া হতো, এখন অ্যাকোয়ারিয়াম ভাঙা, পাইপটা রয়ে গেছে।
রেহানা বেগমের গলার আওয়াজ ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছাল। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং ধারালো গলা।
"বলি ও সাভেরা! নবাবনন্দিনী! কানে কি তুলো গুঁজেছ? নাকি আজ লটারি পেয়েছ যে একবারে বিছানা কামড়ে পড়ে আছ? সাড়ে সাতটা বাজে, খেয়াল আছে?"
রান্নাঘরের স্যাঁতসেঁতে মেঝের এক কোণায় একটা চটের বস্তা পাতা। তার ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে দশ বছরের সাভেরা। তার গায়ের রঙ তামাটে, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। শরীরটা অবিরাম কাঁপছে। রেহানা বেগমের চিৎকার শুনে সে ধুঁকতে ধুঁকতে মাথাটা সামান্য তুলল।
"খালাম্মা... শরীরটা কেমন যেন করতাছে। খুব শীত লাগতাছে খালাম্মা।"
রেহানা বেগম রান্নাঘরে ঢুকে সাভেরার সামনে দাঁড়ালেন। তার মুখে তীব্র অবজ্ঞা।
"শীত লাগতাছে! জ্যৈষ্ঠ মাসের এই গরমে ওনার শীত লাগতাছে! বাহ্, কী চমৎকার বাহানা! প্রতিদিনের এক নাটক। কাজ ফাঁকি দেওয়ার জন্য যতসব ফন্দি-ফিকির শেখা হয়েছে। ওঠ বলছি!"
সাভেরা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "খালাম্মা, মিছা কথা কইতাছি না। মাথায় অনেক পানি ঢালছি, তাও মাথায় আগুন লাগতাছে। একটু শুয়া থাকি খালাম্মা? বেলা বাড়লে উইঠা সব কাম করুম।"
"বেলা বাড়লে করবে? তখন কি নাস্তা দুপুরে খাওয়া হবে?"
রেহানা বেগম আর রাগ সামলাতে পারলেন না। সাভেরার কাঁপতে থাকা চিকন হাতটা ধরে এক ঝটকায় তাকে মেঝে থেকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। সাভেরা টাল সামলাতে না পেরে চুলার পাশে গিয়ে ধাক্কা খেল। রেহানা বেগম হাতের পাইপটা দিয়ে সাভেরার পিঠে সপাং সপাং করে দুটো বাড়ি বসিয়ে দিলেন।
"আর কোনো দিন কি নাস্তা লেট হয়েছে এই বাড়িতে? আজ রাশেদের পরীক্ষা, নিতুর স্কুল—আর তুমি এখানে শুয়ে শুয়ে সিনেমা বানাচ্ছ? ওঠ!"
পাইপের আঘাতে সাভেরা একটা তীব্র আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
ড্রয়িংরুম থেকে রাশেদ চিল্লিয়ে উঠল, "মা! কী শুরু করলে সকাল সকাল? আর কতক্ষণ লাগবে? আমার আটটায় ডিপার্টমেন্টে থাকতে হবে। আজ এক্সাম! সকাল সকাল মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। এই মেয়েটাকে বিদায় করো তো মা, প্রতিদিনের এক ঝামেলা।"
নিতু সোফা থেকে নেমে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। সে সাভেরার কান্নার দিকে তাকালও না। অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, "মা, ও কি আজ টিফিন বানিয়ে দেবে না? আমি কিন্তু না খেয়েই চলে যাব। প্রতিদিন এই মেয়ের জন্য আমার লেট হয়। ও বাসায় থাকলে একটা না একটা ক্যাচাল হবেই।"
মফিজ সাহেব এতক্ষণ চুপচাপ কাগজ দেখছিলেন। এবার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে শান্ত কিন্তু হিমশীতল গলায় বললেন, "রেহানা, একটা ছোটলোকের বাচ্চাকে এত মাথায় তোলার কোনো মানে হয় না। এদের আসকারা দিলেই এরা মাথায় চড়ে বসে। আজ নাস্তা না পেলে রাশেদের পরীক্ষা খারাপ হবে, সেই জ্ঞানটা কি তোমার আছে?"
রেহানা বেগম রান্নাঘর থেকে সাভেরার পিঠে আরেকটা ধাক্কা দিয়ে চুলার কাছে নিয়ে গেলেন।
"শুনলে তো? সবার দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখন চুপচাপ রুটি বেলো। আর একটা বাড়তি কথা বললে আজ সারাদিন ভাত বন্ধ!"
সাভেরা আর কিছু বলল না। দেয়ালটা ধরে কোনোমতে নিজের ছোট ছোট কাঁপতে থাকা পা দুটোর ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল। জ্বলন্ত কয়লার চুলার আঁচটা তার গায়ে লাগতেই ভেতর থেকে জ্বরটা যেন আরও দ্বিগুণ বেগে তেড়ে এল। তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জল বেলন-পিঁড়ির ওপর শুকনো আটার গুঁড়োয় মিশে লেপ্টে গেল।
কিন্তু সেই চোখের জল কিংবা সাভেরার শরীরের ভেতরের আগুনটা দেখার মতো সময় বা মন, এই মধ্যবিত্ত পরিবারের পাঁচজন মানুষের কারোরই নেই। তারা সবাই ঘড়ির টিকটিক কাটার দিকে তাকিয়ে নিজেদের ব্যস্ততা মেলাচ্ছে।
জ্বলন্ত চুলার পাশে দাঁড়িয়ে সাভেরা যখন রুটি বেলছে, তার চোখ ফেটে পানি আসছে। এই পানি আগুনের তাপে শুকিয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু শুকাচ্ছে না। মানুষ যখন অতিরিক্ত একা হয়ে যায়, তখন তার চোখের পানি নাকি শুকায় না, নদী হয়ে যায়।
সাভেরার মনে পড়ল তাদের গ্রামটার কথা। ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানার গাড়াগঞ্জ গ্রাম। কত সুন্দর ছিল দিনগুলো! বাবা কুদ্দুস মিয়ার একটা সবুজ রঙের ইজি-বাইক ছিল। বাবা যখন বিকেলে ইজি-বাইক নিয়ে বাড়ি ফিরতেন, সাভেরা আর তার বড় বোন রেহানা আপা ছুটে যেত। বাবা পকেট থেকে দুই টাকার 'হালুম' লজেন্স বের করে দিতেন। মা তখন উঠোনে বসে সুপারি কাটতেন আর বলতেন, "মেয়েগুলার আসকারা দিয়া মাথাটা খাইলা!"
অথচ গত বছর ঠিক এই জ্যৈষ্ঠ মাসেই একটা কালো রঙের দানব ট্রাক এসে বাবার ইজি-বাইকটাকে পিষে দিয়ে চলে গেল। ইজি-বাইকে তখন মা-ও বসা ছিলেন, বাবার জন্য ভাত নিয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশ এসে বলল, "স্পট ডেড।"
সাভেরা তখন 'স্পট ডেড' শব্দের মানে বুঝত না। সে শুধু দেখল, সাদা কাফনে মোড়ানো দুটো মানুষ উঠোনে শুয়ে আছে, আর চেনা গ্রামটা কেমন যেন অচেনা আর নিঝুম হয়ে গেছে।
দিন বদলাতে সময় লাগে না। গ্রামের কুদ্দুস চাচা একদিন এসে বললেন, "এতিম মেয়ে দুইটা না খেয়ে মরবে। একটা ব্যবস্থা করতে হবে।"
কুদ্দুস চাচা একদিন কার সাথে যেন রেহানা আপার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। কোনো ধুমধাম নেই, সানাই নেই। একটা ভাঙা চৌকির ওপর বসে রেহানা আপা কাঁদছে, আর সাভেরা আপার কোমর জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলছে, "আপা, তুমি আমারে থুইয়া কই যাও? আমি কার কাছে থাকুম?"
রেহানা আপা চলে গেল। আর কুদ্দুস চাচা সাভেরার হাত ধরে বললেন, "কান্দিস না মা। তরে ঢাকা শহরের এক বড় লোকের বাড়ি নিয়া যাই। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। গরমের দিনে এসি চলে, ঠান্ডা পানি। তুই শুধু একটু হাত-পা চালায়া কাজ করবি, আর মাসে মাসে তর আপার কাছে টাকা পাঠায়া দিমু।"
আজ তিন মাস হলো সাভেরা এই ঢাকা শহরের 'রাজপ্রাসাদে' আছে।
এখানে এসি চলে ঠিকই, তবে সেটা শুধু মফিজ সাহেব আর রাশেদদের ঘরে। সাভেরার কপালে জুটেছে রান্নাঘরের এই স্যাঁতসেঁতে মেঝে আর প্লাস্টিকের পাইপের বাড়ি। আজ তার শরীরে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। বেলন-পিঁড়িতে রুটি বেলতে বেলতে সাভেরার মনে হলো, সে যেন আর পারছে না। চারপাশটা কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে।
চুলার আগুনটা লাল থেকে নীল হয়ে যাচ্ছে। সাভেরার মনে হলো, দূর থেকে মা যেন তাকে ডাকছেন, "সাভেরা ও সাভেরা! আয় মা, ইজি-বাইকে ওঠ, আমরা গাড়াগঞ্জ বাজারে যাই।"
সাভেরা বিড়বিড় করে বলল, "মা, আমার পিঠটা বড় দুখায় মা... একটু হাত বুলায়া দিবা?"
তখনি রান্নাঘরের দরজায় আবার ছায়া পড়ল। রেহানা বেগম এসে দাঁড়িয়েছেন, হাতে চায়ের পাতা। সাভেরার ঘোর কেটে গেল। সে আবার কাঁপতে কাঁপতে রুটি সেঁকার তাওয়ায় হাত দিল।
সাভেরার জীবনে মার খাওয়াটা কোনো নতুন ঘটনা ছিল না। আকাশে মেঘ ডাকলে তার বুক কাঁপত। সেদিন ছাদে মেলা কাপড়গুলো ঘরে তুলতে সামান্য দেরি হয়েছিল। জ্যৈষ্ঠের হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে কাপড়গুলো ভিজে চুপসে গেল। আর সেই অপরাধে রেহানা বেগম সাভেরাকে ওলটপালট করে পেটালেন, তারপর শাস্তি হিসেবে তাকে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হলো বৃষ্টির মধ্যে। ঠাণ্ডা পানিতে কাঁপতে কাঁপতে সাভেরার মনে হয়েছিল, সে যেন তাদের গাড়াগঞ্জ গ্রামের কোনো বিলের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে থাকা একটা শাপলা ফুল।
তার চেয়েও বড় ঝড়টা এল সেদিন, যেদিন নিতু আপার দুই হাজার টাকা হারিয়ে গেল। নিতু চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলল, "ওই চোরনি ছাড়া আর কে নেবে? ওর হাত বড় লম্বা!"
মফিজ সাহেব আর রাশেদ ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন, তারা একবারের জন্যও তকালেন না। রেহানা বেগম রান্নাঘর থেকে রুটি বানানোর বেলনটা নিয়ে এলেন। সাভেরাকে ঘরের কোণায় ঠেসে ধরে হাত, পা আর পিঠে নির্বিচারে আঘাত করতে লাগলেন। সাভেরা চিৎকার করে কাঁদছিল, কিন্তু রেহানা বেগম আগেই ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে সেই কান্নার আওয়াজ ভদ্রলোকের পাড়ায় কারও কানে না পৌঁছায়। এক সময় সাভেরার চারপাশটা নিঝুম হয়ে গেল, সে জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর গড়িয়ে পড়ল।
অথচ দুই ঘণ্টা পর নিতু আপার সেই টাকাটা পাওয়া গেল তারই একটা প্যান্টের পেছনের পকেটে। টাকাটা পাওয়ার পর নিতু একটু হাসল, যেন খুব মজার একটা কৌতুক হয়েছে। রেহানা বেগম শুধু বললেন, "কাজের মেয়েদের একটু আধটু শাসন না করলে মাথায় চড়ে বসে। ভালোই হয়েছে, একটা শিক্ষা হলো।"
কিন্তু আজকের সকালটা অন্যরকম ছিল। ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে সাভেরা বুঝতে পারছিল না সে কী করবে। কাকে গিয়ে বলবে যে আজ তার হাত চলছে না? রেহানা বেগম যখন আবার সেই বেলনটা নিয়ে এগিয়ে এলেন এবং সাভেরার মাথায় সজোরে আঘাত করলেন, তখন সাভেরার কোনো চিৎকার বের হলো না। শুধু একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ হলো মাথার ভেতর। তারপর সব চুপ।
. . .
সাভেরা যখন চোখ খুলল, তখন তার চোখের সামনে সাদা সিলিং ফ্যানটা খুব আস্তে আস্তে ঘুরছে। চারপাশটা কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া। বাতাসে একটা ঝাঁঝালো ওষুধের গন্ধ।
পাশের বেডে একজন চাদর গায়ে দেওয়া বয়স্ক লোক শুয়ে আছেন। দরজার বাইরে সাদা অ্যাপ্রন পরা দুজন ডাক্তার ফিসফিস করে কথা বলছেন। সাভেরা আবছা শুনতে পেল একজন বলছেন, "বাচ্চাটার ওপর কী অমানুষিক নির্যাতনটাই না করা হয়েছে! মাথাটা ফেটে গেছে..."
সাভেরার মাথার ডানপাশটা ভারী হয়ে আছে। সে নড়তে পারল না। তবে তার চোখের একদম সামনে একটা চেনা মুখ ভেসে উঠল। কুদ্দুস চাচা। কুদ্দুস চাচার চোখ দুটো লাল, তিনি সাভেরার পায়ের কাছে বসে আছেন।
সাভেরাকে চোখ মেলতে দেখে কুদ্দুস চাচা ভাঙা গলায় বললেন, "মা সাভেরা! তুই চোখ মেলছিস? ভয় পাস না মা। ওই ডাইনি বেটিরে পুলিশে ধইরা নিয়া গেছে। পাড়ার মানুষ পুলিশ ডাকছিল।"
সাভেরা পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। 'পুলিশ' কী জিনিস সে জানে, কিন্তু রেহানা বেগমকে কেন পুলিশ ধরল, সেটা সে বুঝতে পারল না। খালাম্মা তো প্রতিদিনই মারেন, আজ নতুন কী হলো?
তার শরীরটা ভীষণ হালকা লাগছে। এত হালকা যে মনে হচ্ছে একটা হালকা বাতাস দিলেই সে উড়ে যাবে। সাভেরা খুব ক্ষীণ গলায় বলল, "কুদ্দুস চাচা..."
"ক ক মা, কী কবি?" কুদ্দুস চাচা সাভেরার কপালে হাত রাখলেন। হাতটা বরফের মতো ঠাণ্ডা।
"খালাম্মা জেল থেকে আইলে আমারে আবার মারব চাচা? তুমি কি আমারে আবার অন্য কোনো বাড়িতে কামে দিবা?"
কুদ্দুস চাচা আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি মুখটা ঘুরিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
সাভেরা আর কুদ্দুস চাচার দিকে তাকাল না। সে জানালার বাইরে তাকাল। আজ আকাশে কোনো মেঘ নেই। চমৎকার একটা নীল আকাশ। বহুদূর থেকে একটা সবুজ রঙের ইজি-বাইকের হর্নের শব্দ শোনা যাচ্ছে। 'পম্পম... পম্পম...'
বাবা ইজি-বাইকটা নিয়ে হাসপাতালের বারান্দার ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। পেছনে মা বসে আছেন, মার পরনে সেই লাল পেড়ে শাড়িটা। মা হাত নেড়ে ডাকছেন, "সাভেরা ও সাভেরা! আর দেরি করিস না মা, অনেক তো কাম করলি। এবার আয়, বাড়ি যাই।"
সাভেরা মনে মনে বলল, "আসতাছি মা। আমার বড় ক্লান্তি লাগতাছে। একটু ঘুমামু।"
সাভেরার চোখের কোণ দিয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে কান বেয়ে বালিশে মিশে গেল। তার চোখের সামনের ধোঁয়াটে পৃথিবীটা আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গেল। একবারে দুধের মতো সাদা, যেখানে কোনো নীল পাইপ নেই, কোনো রুটি বানানোর বেলন নেই, আর কোনো বন্ধ জানালা নেই। রয়ে গেল কেবল এক অনন্ত,শান্ত যাত্রা।

 


এ জাতীয় আরো খবর